নিজস্ব প্রতিবেদক
একাধিকবার চুল্লি গুলো ধ্বংস হলেও থামেনি সিন্ডিকেট, রাজনৈতিক ছত্রছায়া ও দুর্নীতির অভিযোগে উত্তাল এলাকা। যশোরের অভয়নগর উপজেলার সিদ্দিপাশা ইউনিয়নের আমতলা ও সোনাতলা গ্রাম এখন যেন এক অঘোষিত ‘ধোঁয়ার নগরী’। কাঠ পুড়িয়ে কয়লা তৈরির শতাধিক অবৈধ চুল্লির বিষাক্ত ধোঁয়ায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে জনজীবন। পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি, বন উজাড় এবং শ্বাসকষ্টসহ নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
সরেজমিনে দেখা গেছে, প্রতিদিন হাজার হাজার মণ কাঠ পুড়িয়ে কয়লা তৈরি করা হচ্ছে এসব চুল্লিতে। এতে শুধু পরিবেশ দূষণই নয়, এলাকার প্রাকৃতিক ভারসাম্য মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে। আশপাশের গাছপালা শুকিয়ে যাচ্ছে, কৃষিজমির উৎপাদন কমে যাচ্ছে এবং শিশু ও বৃদ্ধদের মধ্যে শ্বাসকষ্ট, হাঁপানি ও চোখের জ্বালাপোড়া বেড়ে গেছে উদ্বেগজনক হারে। অভিযান হলেও থামেনি অবৈধ কার্যক্রম,চলতি বছরের জানুয়ারি ১২ তারিখে উপজেলা প্রশাসন ও পরিবেশ অধিদপ্তর খুলনার যৌথ উদ্যোগে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে ৭৪ টি অবৈধ চুল্লি ধ্বংস করা হয়। কিন্তু স্থানীয়দের অভিযোগ, এই অভিযান ছিল সাময়িক। বাকি প্রায় ১৫০ টি চুল্লী ধ্বংস না করেই রীতিমতো প্রশাসন নিরব হয়ে যায়। ফলে প্রশ্ন থাকে ২০০ টার অধিক চুল্লী থাকার পরেও প্রশাসন ৭৪ টি চুল্লী ধ্বংস করে নিরব হয়ে যাওয়ার কারণ কী? অন্যদিকে অভিযানের এক মাস না পেরোতেই পুনরায় গড়ে ওঠে চুল্লিগুলো। গত ৬ মাসের মধ্যে আর কোনো অভিযান না হওয়ায় সিন্ডিকেট আরও শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। বর্তমানে ২ শতাধিক চুল্লি চালু রয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। সিন্ডিকেটের দাপট, মুখ খুলতে ভয় এলাকাবাসীর স্থানীয়দের দাবি, একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট এই অবৈধ ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করছে। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, রাজনৈতিক ছত্রছায়া, অসাধু প্রশাসনিক কর্মকর্তা এবং কিছু সাংবাদিকের সহায়তায় তারা নির্বিঘ্নে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। সোনাতলা ও আশপাশের এলাকায় জিয়া মোল্যা, ছোট্ট মোল্যা, শহিদ মোল্যা, হারুন মোল্যা, রফিক মোল্যা, তৌকির মোল্যা, কবীর শেখ, হাবিব হাওলাদার, তসলিম মিয়া, মনির শেখ, কামরুল ফারাজী এবং ধূলগ্রামের হরমুজ সর্দার, রকশেদ সর্দার, ফারুক হাওলাদারসহ আরও অনেকে এই ব্যবসার সঙ্গে জড়িত বলে অভিযোগ উঠেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক চুল্লি মালিক বলেন, ঘাটে ঘাটে টাকা দিয়েই আমাদের ব্যবসা চালাতে হয়। স্থানীয় থেকে শুরু করে বিভিন্ন মহল ম্যানেজ করেই কাজ করতে হয়। আরেকজন জানান, একজন সিনিয়র সাংবাদিককে মাসে নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা দেওয়া হয়, তাই কোনো ঝামেলা হয় না। অভিযোগ করেও প্রতিকার নেই, স্থানীয় বাসিন্দারা বারবার বিভিন্ন দপ্তরে অভিযোগ দিয়েও কোনো স্থায়ী সমাধান পাননি। মানববন্ধন, প্রতিবাদ কর্মসূচি, সবই হয়েছে, কিন্তু ফলাফল শূন্য। এতে হতাশ হয়ে অনেকেই এখন প্রতিবাদ করার সাহস হারিয়ে ফেলেছেন। একজন বাসিন্দা বলেন, আমরা এখন ধরে নিয়েছি, আইনের চেয়ে তাদের ক্ষমতা বেশি। তাই আর কেউ মুখ খুলি না। পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের মারাত্মক ঝুঁকি বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের চুল্লি থেকে নির্গত ধোঁয়ায় কার্বন মনোক্সাইডসহ ক্ষতিকর গ্যাস থাকে, যা দীর্ঘমেয়াদে ফুসফুসের রোগ, হৃদরোগ এবং ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ায়। একইসঙ্গে বন উজাড় হওয়ায় জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবও তীব্রতর হচ্ছে। প্রশাসনের প্রতিক্রিয়া যশোর পরিবেশ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মোহাম্মদ আতাউর রহমান বলেন, চুল্লিগুলোর বিষয়ে আমাদের কাছে তথ্য রয়েছে। খুব শিগগিরই অভিযান পরিচালনা করে এগুলো ধ্বংস করা হবে। অভয়নগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সালাউদ্দিন দিপু বলেন, খুলনা পরিবেশ অধিদপ্তরের সঙ্গে সমন্বয় করে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সচেতন মহলের দাবি সচেতন মহল বলছে, শুধু অভিযান নয়, স্থায়ীভাবে এই সিন্ডিকেট ভেঙে দিতে হবে। সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ, নিয়মিত মনিটরিং এবং বিকল্প জীবিকার ব্যবস্থা না করলে এই অবৈধ কার্যক্রম বন্ধ করা সম্ভব নয়। তাদের দাবি, অবিলম্বে সব চুল্লি ধ্বংস করে জড়িতদের আইনের আওতায় আনা না হলে অভয়নগরের পরিবেশ ও জনজীবন সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত হয়ে পড়বে।