লেখকঃ- মোঃ কামাল হোসেন
যশোরের অভয়নগরে চলতি বছরের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলাফল নিয়ে শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও সচেতন মহলে দেখা দিয়েছে উদ্বেগ। উপজেলার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রত্যাশিত ফল না আসায় প্রশ্ন উঠেছে শিক্ষার মান, শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া এবং প্রতিষ্ঠান পরিচালনার দীর্ঘদিনের নানা অনিয়ম নিয়ে। স্থানীয় একাধিক ব্যক্তি ও অভিভাবকের অভিযোগ, রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে শিক্ষক নিয়োগে অনভিজ্ঞ ও অযোগ্য ব্যক্তিদের সুযোগ করে দেওয়া এবং এর মাধ্যমে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দক্ষতার পরিবর্তে তদবিরনির্ভর সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠার নেতিবাচক প্রভাব এখন এসএসসি ফলাফলে দৃশ্যমান হচ্ছে। এসব অভিযোগের কেন্দ্রে সাবেক সংসদ সদস্য রনজিত কুমার রায় এবং তাঁর সময়কার প্রভাববলয়ের সঙ্গে যুক্ত একটি কথিত দালাল চক্রের’ নামও উঠে এসেছে। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা যাচাই এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য নেওয়া জরুরি। অভিযোগকারীদের দাবি, অভয়নগরের কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে মেধা, দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার পরিবর্তে রাজনৈতিক পরিচয়, সুপারিশ ও অর্থনৈতিক লেনদেনকে গুরুত্ব দেওয়ার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। এর ফলে শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা ও বিষয়ভিত্তিক প্রস্তুতি না থাকা ব্যক্তিরাও শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার সুযোগ পেয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
অভিভাবকদের প্রশ্ন, একজন শিক্ষক যদি নিজ বিষয়েই যথাযথ দক্ষতা না রাখেন, তাহলে তাঁর কাছে পড়া শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ভালো ফলাফল কীভাবে প্রত্যাশা করা যায়? স্থানীয়দের অভিযোগ, সাবেক এমপি রনজিত কুমার রায়ের রাজনৈতিক প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে একটি সংঘবদ্ধ গোষ্ঠী বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নিয়োগ, কমিটি গঠন ও প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডে প্রভাব বিস্তার করত। এই গোষ্ঠীর মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগের নামে অর্থ আদায় ও পছন্দের প্রার্থীকে সুযোগ করে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে সুনির্দিষ্ট নথি, নিয়োগসংক্রান্ত রেকর্ড বা আর্থিক লেনদেনের প্রমাণ প্রকাশ্যে না আসায় বিষয়গুলো তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।
শিক্ষাবিদদের মতে, একটি প্রতিষ্ঠানের ফলাফল শুধু পরীক্ষার কয়েক মাসের প্রস্তুতির ওপর নির্ভর করে না। শিক্ষক নিয়োগ, পাঠদানের মান, নিয়মিত ক্লাস, শিক্ষকদের উপস্থিতি, প্রতিষ্ঠান পরিচালনা, অভ্যন্তরীণ মূল্যায়ন এবং অভিভাবক-শিক্ষক সমন্বয়, সবকিছুর সম্মিলিত ফলাফলই এসএসসি পরীক্ষায় প্রতিফলিত হয়। তাই অভয়নগরের ফলাফল খারাপ হওয়ার পেছনে যদি সত্যিই দীর্ঘদিনের শিক্ষক সংকট, অনভিজ্ঞ শিক্ষক নিয়োগ কিংবা প্রশাসনিক অনিয়ম থাকে, তাহলে শুধু শিক্ষার্থীদের দায়ী না করে পুরো ব্যবস্থাটি খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
অভিভাবক ও সচেতন নাগরিকদের দাবি, গত কয়েক বছরে অভয়নগরের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগের পূর্ণাঙ্গ তথ্য যাচাই করা হোক। নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি, আবেদনকারীদের যোগ্যতা, নিয়োগ পরীক্ষার নম্বর, নিয়োগ কমিটির সিদ্ধান্ত, বোর্ডের অনুমোদন এবং নিয়োগসংক্রান্ত আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ থাকলে সেগুলোও তদন্তের আওতায় আনা হোক। একই সঙ্গে যেসব প্রতিষ্ঠানে ধারাবাহিকভাবে ফলাফল খারাপ হচ্ছে, সেসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের পাঠদানের মান, উপস্থিতি ও বিষয়ভিত্তিক দক্ষতা মূল্যায়নের দাবি উঠেছে।
অভয়নগরের শিক্ষাঙ্গন নিয়ে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, যোগ্য শিক্ষক বাদ দিয়ে যদি রাজনৈতিক প্রভাব বা তদবিরে নিয়োগ দেওয়া হয়ে থাকে, তাহলে তার দায় নেবে কে? শিক্ষক নিয়োগ যদি সত্যিই কোনো দালাল চক্রের নিয়ন্ত্রণে থেকে থাকে, তাহলে সেই চক্রের সঙ্গে কারা জড়িত? কতগুলো প্রতিষ্ঠানে এমন নিয়োগ হয়েছে? নিয়োগে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ থাকলে তার প্রমাণ কোথায়? আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, এই ব্যবস্থার কারণে শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবনের যে ক্ষতি হয়েছে, তার দায়ভারই বা কে নেবে?
শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ রক্ষায় কঠোর পদক্ষেপ জরুরি
এসএসসি পরীক্ষায় ফল বিপর্যয়কে শুধু খারাপ ফল হিসেবে দেখলে সমস্যার মূল কারণ আড়ালেই থেকে যাবে। প্রয়োজন প্রতিষ্ঠানভিত্তিক ফলাফল বিশ্লেষণ, শিক্ষক নিয়োগের স্বচ্ছতা যাচাই এবং শিক্ষার মান উন্নয়নে কার্যকর পদক্ষেপ। অভিভাবকদের প্রত্যাশা, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত পরিবেশে যোগ্য ও দক্ষ শিক্ষক নিয়োগ নিশ্চিত করা হবে। একই সঙ্গে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ তদন্তে সত্য প্রমাণিত হলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কারণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ক্ষতি মানে শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের ক্ষতি নয়, এর সরাসরি প্রভাব পড়ে শত শত শিক্ষার্থীর ভবিষ্যতের ওপর।