বিশেষ প্রতিনিধি
তদন্ত এখনো শুরু হয়নি। এরই মধ্যে সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য ২৪ কর্মকর্তা-কর্মচারীর একটি তালিকা তৈরি হওয়ায় সিলেট পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ের চলমান তদন্তের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ উঠেছে, প্রকৃত ভুক্তভোগী ও অভিযোগকারীদের বাদ দিয়ে অভিযুক্তদের পছন্দের ব্যক্তিদেরই সাক্ষ্যদানের জন্য বাছাই করা হয়েছে। এমনকি কারা কী বক্তব্য দেবেন, তার একটি সম্ভাব্য কাঠামোও আগে থেকে তৈরি করে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।
সিলেট পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ের উপপরিচালক মো. নিয়াজুর রহমান ও তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী ডা. সুবর্ণা রায় (তুলি)-কে রক্ষায় এমন একটি ‘সাজানো তদন্তের’ ছক করা হয়েছে বলে অভিযোগ তুলেছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কেউ কেউ। ফলে তদন্ত শুরুর আগেই প্রশ্ন উঠেছে—এই তদন্তে প্রকৃত সত্য বেরিয়ে আসবে, নাকি অভিযোগ ধামাচাপা দেওয়ার আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হবে?
মহাপরিচালক: অনিয়ম হলে দায় এড়ানোর সুযোগ নেই
এ বিষয়ে পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. জিন্নাত রেহানা সোমবার বলেন, ডা. সুবর্ণা রায় তুলিকে ইতোমধ্যে সিলেট সদর থেকে সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুরে বদলি করা হয়েছে। উপপরিচালক মো. নিয়াজুর রহমানের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি জানান, প্রতিমন্ত্রীর নির্দেশনায় তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্তে কোনো ধরনের অনিয়ম হলে এর দায় এড়ানোর সুযোগ নেই।
ড. জিন্নাত রেহানা আরও বলেন, সিলেটে ভুক্তভোগী কর্মকর্তা-কর্মচারীরা যাতে নির্ভয়ে সাক্ষ্য দিতে পারেন এবং তদন্ত কাজে সহযোগিতা করেন, সে বিষয়ে তিনি নির্দেশনা দিয়েছেন। কোনো ধরনের অনিয়ম বরদাশত করা হবে না বলেও তিনি জানান।
যেভাবে শুরু হয় তদন্তের উদ্যোগ
গত ৯ আগস্ট দৈনিক যুগান্তরে ‘স্বামী উপপরিচালক, ক্ষমতার কেন্দ্রে স্ত্রী’ শিরোনামে সিলেট পরিবার পরিকল্পনা দপ্তরের বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়।
এর পরিপ্রেক্ষিতে ১০ আগস্ট পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর ঢাকা বিভাগের পরিবার পরিকল্পনা পরিচালক দেওয়ান মোর্শেদ কামালকে সরেজমিন তদন্তের নির্দেশ দেয়।
আজ সকাল সাড়ে ৯টায় সিলেট জেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ে তদন্ত অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। তবে তদন্ত শুরুর আগেই সাক্ষীর তালিকা নিয়ে আপত্তি ওঠায় পুরো প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা নিয়ে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
২৪ জনের তালিকা নিয়ে যত প্রশ্ন
তদন্ত-সংক্রান্ত নোটিশের সঙ্গে ২৪ কর্মকর্তা-কর্মচারীর একটি তালিকা সংযুক্ত করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, তদন্তের স্বার্থে প্রকৃত অভিযোগকারী ও ক্ষতিগ্রস্তদের বক্তব্য নেওয়ার পরিবর্তে উপপরিচালকের পছন্দের ব্যক্তিদের সাক্ষ্যদানের জন্য বেছে নেওয়া হয়েছে।
তাদের দাবি, ‘কে কী বলবেন’—এমন একটি সম্ভাব্য বক্তব্যের কাঠামোও আগে থেকেই তৈরি করে দেওয়া হয়েছে। এতে তদন্ত কমিটির সামনে স্বাধীনভাবে মতামত দেওয়ার সুযোগ কতটা থাকবে, তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা তাৎক্ষণিকভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
কথা বললে হয়রানির আশঙ্কা
একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী অভিযোগ করেন, উপপরিচালক মো. নিয়াজুর রহমানের বিরুদ্ধে কথা বললে প্রশাসনিক হয়রানি, বদলি কিংবা অন্য কোনো ধরনের চাপের মুখে পড়তে হতে পারে। এ আশঙ্কায় অনেকে প্রকাশ্যে মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছেন না।
তাদের প্রশ্ন, যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তাদের পছন্দের ব্যক্তিদের বক্তব্যের ওপর নির্ভর করে যদি অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা হয়, তাহলে প্রকৃত ঘটনা কীভাবে বেরিয়ে আসবে?
ভুক্তভোগীদের দাবি, তদন্ত কমিটির উচিত সিলেট জেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ের সব কর্মকর্তা-কর্মচারীর কাছ থেকে স্বাধীনভাবে তথ্য নেওয়া। পাশাপাশি অভিযোগকারী ও ভুক্তভোগীদের আলাদাভাবে বক্তব্য গ্রহণ এবং প্রয়োজন হলে গোপনে লিখিত বক্তব্য নেওয়ার ব্যবস্থা করা।
‘আসামির লোক সাক্ষী দিলে নিরপেক্ষতা কোথায়?’
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কেউ কেউ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, পুরো প্রক্রিয়াটি এমন পর্যায়ে যাচ্ছে যেন—‘কাজি বিচার করে, আর আসামির লোক সাক্ষী দেয়।’
তাদের আশঙ্কা, প্রকৃত ভুক্তভোগীদের বাদ দিয়ে নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের সাক্ষ্য গ্রহণ করা হলে তদন্তটি কেবল আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত হতে পারে।
অভিযুক্ত নিয়াজুর রহমানের বক্তব্য পাওয়া যায়নি
অভিযোগগুলোর বিষয়ে বক্তব্য জানতে সিলেট পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ের উপপরিচালক মো. নিয়াজুর রহমানের মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ফলে এ বিষয়ে তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
তদন্তের মাধ্যমে অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই এবং প্রকৃত ঘটনা বেরিয়ে আসে কি না—এখন সেটিই সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রধান প্রত্যাশা।
সূত্র: দৈনিক যুগান্তর