বিশেষ প্রতিনিধি, যশোর:
যে হাতে ১৭টি বছর ধরে জ্বলন্ত মশাল আর দলীয় পতাকা শক্ত করে ধরা ছিল, যে বুকটা বুলেট আর স্বৈরাচারের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে শার্শা রাজপথে বিএনপির ঝাণ্ডা আগলে রেখেছিল, আজ সেই বুকে জমেছে এক বিষাদময় পাথর। যশোরের শারশা উপজেলা যুবদলের সদ্য সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক, রাজপথের অকুতোভয় নেতা জনাব শহিদুল ইসলাম শহীদকে গতকাল যুবদলের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের নির্দেশনায় প্রেরিত এক চিঠির মাধ্যমে দলীয় পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। এক নিমেষেই একটি কাগজপত্রের খসড়ায় ঢাকা পড়ে গেছে এক নেতার বিগত ১৭ বছরের অবর্ণনীয় ত্যাগ, অন্ধকার কারাগারের দিনগুলো আর পরিবারহীন ১৮ বছরের ফেরারি জীবনের নির্মম ইতিহাস।
বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর থেকেই কেবল শারশা নয়, পুরো যশোর জেলা জুড়ে বইছে আলোচনা ও সমালোচনার ঝড়। রাজপথের একজন পরীক্ষিত ও পোড় খাওয়া সৈনিকের এমন বিদায়ে হতবাক তৃণমূলের সাধারণ নেতা-কর্মীরা।
"আমার বিরুদ্ধে গোল্ড বা মাদকের একটি মামলাও নেই": কান্নাজড়ানো কণ্ঠে শহীদের আকুতি
দলীয় সিদ্ধান্ত প্রকাশের পর বাকরুদ্ধ ও তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে জনাব শহিদুল ইসলাম শহীদ বলেন,
নিঃসন্দেহে আমার সাথে চরম অন্যায় করা হয়েছে। দলের সবচেয়ে দুর্দিনে ও দুঃসময়ে যখন অনেকে ঘরের কোণে আত্মগোপনে ছিল, তখন আমি জীবনের সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করে দলের জন্য দিন-রাত কাজ করেছি। অথচ আজকে তদন্ত রিপোর্টে আমার বিরুদ্ধে সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন অভিযোগ তুলে রিপোর্ট দেওয়া হয়েছে। যে অভিযোগে আমাকে অভিযুক্ত করা হয়েছে—আমাকে বলা হয়েছে আমি নাকি মাদক ও স্বর্ণের (গোল্ড) ব্যবসার সাথে জড়িত!
আপনারা খোঁজ নিয়ে দেখুন, পুরো বাংলাদেশের কোনো থানায় বা আদালতে আমার বিরুদ্ধে স্বর্ণ বা মাদকের একটি মামলা তো দূরের কথা, কোনো সাধারণ অভিযোগও নেই। কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ ছাড়াই শুধুমাত্র একটি বানোয়াট রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে আমাকে আমার স্বপ্নের পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হলো। আমার একটাই কথা—কেউ কি দেখাতে পারবে আমার বিরুদ্ধে এসবের বিন্দুমাত্র সত্যতা?
শারশা উপজেলা বিএনপি ও যুবদলের স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০০৭ সাল থেকে আওয়ামী লীগের দীর্ঘ ১৭-১৮ বছরের একচ্ছত্র শাসনের সময়ে শারশায় যখন বিরোধী দলের রাজনীতি করা ছিল জীবন-মরণের খেলা, তখন সাধারণ মানুষ ও কর্মীদের পাশে সাহস হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন এই শহীদ। তৎকালীন শাসকগোষ্ঠীর রক্তচক্ষুকে তোয়াক্কা না করে তিনি মিছিলে ও লড়াইয়ে থেকেছেন সবার আগে।রাজনীতি করার অপরাধে তাঁর ওপর নেমে এসেছিল নির্মম মাশুল। রাজপথের আন্দোলন স্তব্ধ করতে তাঁর বিরুদ্ধে একের পর এক ১২টি মিথ্যা ও গায়েবি রাজনৈতিক মামলা চাপিয়ে দেওয়া হয়। জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সময়গুলোতে তাঁকে অন্ধকার কারাগারে বন্দি জীবন কাটাতে হয়েছে।আওয়ামী ক্যাডারদের হুলিয়া ও জীবননাশের হুমকির কারণে দীর্ঘ ১৮টি বছর তিনি নিজের জন্মভূমি, স্ত্রী-সন্তান ও পরিবার ছেড়ে যাযাবরের মতো ফেরারি জীবন যাপন করেছেন।
এত নির্যাতন, জেল-জুলুম ও ঘরছাড়ার যন্ত্রণার পরও তিনি কোনোদিন শহীদ জিয়ার আদর্শ এবং দেশনায়ক তারেক রহমানের নির্দেশনা থেকে একচুল বিচ্যুত হননি। ২০১৪ সালের তীব্র উপজেলাভিত্তিক আন্দোলন বাস্তবায়ন কমিটির অন্যতম মূল কাণ্ডারী হিসেবে রাজপথে রক্ত দিয়েছেন। ২০১৮ সালের রাতে ভোট ডাকাতির বিতর্কিত নির্বাচনের দিনেও শার্শার রাজপথে অকুতোভয় সৈনিকের মতো পাহারা দিয়েছেন তিনি।
অব্যাহতির খবর ছড়িয়ে পড়ার পর আজ শারশা উপজেলাসহ যশোরের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে ক্ষোভে ফেটে পড়েন তৃণমূলের নেতা-কর্মীরা। শহিদুল ইসলাম শহীদের স্বপদে পুনর্বহালের দাবিতে রাজপথে আয়োজিত হয় বিশাল মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশ।মানববন্ধনে অংশ নেওয়া এক আবেগপ্লুত কর্মীর বক্তব্য—
"আমরা বিগত ১৭ বছর ধরে শহীদ ভাইকে খুব কাছ থেকে দেখেছি। যখনই আমরা বিপদে পড়েছি, পুলিশের তাড়া খেয়েছি, শহীদ ভাই আমাদের আগলে রেখেছেন। যদি উনার কোনো ছোটখাটো ভুল-ভ্রান্তি থেকেও থাকে, তবে কেন্দ্রীয় অভিভাবকরা তাঁকে কারণ দর্শানোর নোটিশ বা ওয়ার্নিং দিতে পারতেন। কিন্তু সরাসরি একেবারে অব্যাহতি? এটা আমাদের মতো ত্যাগী কর্মীদের পক্ষে মেনে নেওয়া মারাত্মক কষ্টকর। যদিও দলের সিদ্ধান্তের ওপর আমাদের কথা বলার সুযোগ নেই, কিন্তু হাইকমান্ডের কাছে অনুরোধ, আপনারা বিষয়টি পুনর্মূল্যায়ন করুন। শহীদের মতো নেতা যশোরে খুব কমই আছে।"নাম প্রকাশ না করার শর্তে শারশা উপজেলা যুবদলের এক প্রবীণ সাবেক নেতা তীব্র আক্ষেপ নিয়ে বলেন, বিগত ১৭ বছর যখন শারশায় মিছিল-মিটিংয়ের জন্য দাওয়াত দিয়েও কাউকে খুঁজে পাওয়া যেত না, বড় বড় নেতারা গা ঢাকা দিয়ে বসে থাকত, তখন ফেরারি আসামী হয়েও সমস্ত আন্দোলন-সংগ্রাম একাই সামলেছেন এই শহীদ। আর আজ দল যখন ভালো সময়ে এসেছে, তখন মিথ্যা অভিযোগ এনে তাঁকেই বহিষ্কার করা হলো! এটা রাজনীতির এক কালো এবং নিষ্ঠুরতম অধ্যায়।"
এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় যুবদলের এক দায়িত্বশীল নেতার সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, যুবদলের কাছে ব্যক্তির চেয়ে দল সবসময় বড়। দলীয় শৃঙ্খলা রক্ষা ও ভাবমূর্তি বজায় রাখার প্রশ্নে হাইকমান্ড কঠোর। কোনো ব্যক্তির স্বার্থের চেয়ে সংগঠনের স্বার্থ আগে। যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, তা পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত এবং প্রমাণের ভিত্তিতেই গ্রহণ করা হয়েছে।"
রাজনীতির জটিল সমীকরণে হয়তো অনেক কিছুর পরিবর্তন ঘটে, কিন্তু রক্তে ভেজা ত্যাগের ইতিহাস চাইলেই মুছে ফেলা যায় না। যশোর ও শার্শা রাজপথে যে নেতার রক্তের দাগ লেগে আছে, সেই নেতার রাজনৈতিক জীবনের এমন আকস্মিক ও করুণ পরিণতি মানতে পারছে না সাধারণ কর্মীরা। যশোর জেলা বিএনপির উচ্চপর্যায় ও যুবদলের কেন্দ্রীয় হাইকমান্ডের কাছে সাধারণ তৃনমূলের একটাই ব্যাকুল আকুতি, শার্শা রাজপথের অবিনাশী সৈনিক শহিদুল ইসলাম শহীদের বিরুদ্ধে আসা অভিযোগগুলো যেন পুনরায় নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা হয় এবং একজন খাঁটি রাজপথের যোদ্ধাকে তাঁর প্রাপ্য সম্মান ও পদ ফিরিয়ে দেওয়া হয়।