বিশেষ প্রতিবেদনঃ এ আর নাহিদ (যশোর )
রাজনীতিতে অনেকের আগমন ঘটলেও সবাই ইতিহাসের পাতায় স্থায়ী স্থান করে নিতে পারেন না। ইতিহাস হতে হলে প্রয়োজন নিজের অজান্তে দলের প্রতি অসীম ভালোবাসা, নেতা-কর্মীদের প্রতি স্বার্থহীন মনোভাব, দল-মত ও ছোট-বড় সবার প্রতি পক্ষপাতহীন সজাগ দৃষ্টি, দুষ্টের দমন ও শিষ্টের প্রতি মহানুভবতা এবং দেশ ও জাতির প্রতি অকৃত্রিম দায়িত্ববোধ। দলীয় স্বার্থে নিজ স্বার্থকে বিসর্জন দিয়ে যিনি অকুতোভয়ে সামনে এগিয়ে যেতে পারেন, তিনিই কেবল ইতিহাস হয়ে উঠতে পারেন। যশোর জেলার শার্শা উপজেলার রাজনীতিতে তেমনি এক উজ্জ্বল ইতিহাস ও অনুকরণীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হচ্ছেন আলহাজ্ব খায়রুজ্জামান মধু। তিনি শুধু একজন রাজনীতিবিদ নন, তিনি শার্শা উপজেলা বিএনপির ইতিহাসের এক জীবন্ত অধ্যায়।
খায়রুজ্জামান মধু শার্শা উপজেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক, সাবেক সভাপতি ও সাবেক আহ্বায়ক হিসেবে দীর্ঘকাল সফলতার সাথে দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমানে তিনি শার্শা উপজেলা বিএনপির প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন—তার সুদীর্ঘ অভিজ্ঞতা ও দূরদর্শী নেতৃত্ব আজও শার্শা উপজেলার বিএনপি ও এর অঙ্গ-সংগঠনকে সঠিক পথের দিশা দেখায়।
১৯৬৯ সালে ঐতিহাসিক ছাত্র আন্দোলনের উত্তাল দিনগুলোতে ছাত্ররাজনীতিতে যোগদানের মাধ্যমে খায়রুজ্জামান মধুর রাজনৈতিক জীবনের শুভসূচনা ঘটে। রাজনৈতিক জীবনের প্রারম্ভেই তিনি যশোর সরকারি এম. এম. কলেজ ছাত্র ইউনিয়নের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৭৭ সালে জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক দল (জাগদল)-এর থানা পর্যায়ের সদস্য নির্বাচিত হন। একই বছরে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ঐতিহাসিক 'খাল খনন কর্মসূচি'তে অত্যন্ত সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন।
১৯৭৮ সালে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) প্রতিষ্ঠার সূচনা লগ্ন থেকেই তিনি শার্শা থানা কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য হিসেবে দায়িত্বপ্রাপ্ত হন। ১৯৮৫ সালে শার্শা থানা বিএনপির সাধারণ সভায় সর্বসম্মতিক্রমে তিনি ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক হিসেবে নির্বাচিত হন। রাজনৈতিক জীবনে প্রলোভন কিংবা নিপীড়ন—কোনো কিছুই খায়রুজ্জামান মধুকে আদর্শচ্যুত করতে পারেনি।
১৯৮৬ সালে তৎকালীন এরশাদ সরকারের জাতীয় পার্টি তাঁকে দলীয় মনোনয়ন এবং বিনা ভোটে জাতীয় সংসদের মাননীয় সংসদ সদস্য (MP) করার লোভনীয় প্রস্তাব দেয়। কিন্তু তিনি সেই প্রস্তাব সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেন এবং শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক আদর্শের ওপর অটল ও অবিচল থাকেন।
১৯৯০ সালের ঐতিহাসিক এরশাদবিরোধী স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে তিনি রাজপথে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। আন্দোলন দমন করতে তৎকালীন সরকার তাঁকে গ্রেপ্তার করে। সে সময় টানা এক মাস তাঁকে যশোর সেনানিবাসে আটকে রেখে কয়েক দফায় অমানবিক ও নির্মম শারীরিক নির্যাতন চালানো হয়। তবুও তিনি বিএনপির পতাকা হাতে উজ্জ্বল থেকে সব সময় রাজপথে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন।
১৯৯১ সাল থেকে শুরু করে এ পর্যন্ত যে কয়টি জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি অংশগ্রহণ করেছে, তার সবকটিতেই যশোর-১ (৮৫) আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থীর পক্ষে পরিচালনা কমিটির প্রধান হিসেবে তিনি দক্ষতার সাথে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯২ সালে উপজেলা বিএনপির সম্মেলনে প্রত্যক্ষ ভোটের মাধ্যমে তিনি সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৯৬ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন প্রত্যাশী হিসেবে প্রথমবার দলীয় ফরম সংগ্রহ করেন। ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত গণতান্ত্রিক আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় অংশগ্রহণ করে একাধিক হামলা, মিথ্যা মামলা ও নির্যাতনের শিকার হন।
২০০৩ সালে উপজেলা বিএনপির সম্মেলনে পুনরায় প্রত্যক্ষ ভোটের মাধ্যমে বিপুল জনসমর্থনে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ২০০৯ সালের উপজেলা বিএনপির সম্মেলনে তিনি সভাপতি নির্বাচিত হন এবং অত্যন্ত সাফল্যের সাথে ২০২৫ সাল পর্যন্ত সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।
২০০৭ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি এক পরিকল্পিত নীল নকশার অংশ হিসেবে অস্ত্র ও গুলি দিয়ে যৌথ বাহিনী তাঁকে আটক করে। আটকের সময় তাঁকে নির্মমভাবে রক্তাক্ত ও জখম করে মৃত মনে করে খোলা মাঠে ফেলে রেখে যাওয়া হয়। এই মিথ্যা ও সাজানো মামলায় নিম্ন আদালত তাঁকে ১৭ বছর ৬ মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ডের আদেশ দেন। দীর্ঘ ১১ মাস কারাভোগের পর মহামান্য হাইকোর্টে জামিনের আবেদন জানালে আদালত তাঁর জামিন মঞ্জুর করেন। পরবর্তীতে মহামান্য আদালত কর্তৃক মিথ্যা মামলাটি সম্পূর্ণ খারিজ হয় এবং তিনি বেকসুর খালাস লাভ করেন।
বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে যখন দলের চরম ক্রান্তিকাল চলছিল, অনেকে যখন ভয়ের মুখে নিশ্চুপ হয়ে গিয়েছিলেন, তখন খায়রুজ্জামান মধু বুক চিতিয়ে রাজপথে দাঁড়িয়েছেন। রাজপথে দলীয় প্রতিটি কর্মসূচি সফল করতে গিয়ে তিনি বারবার নির্মম পুলিশি হয়রানি ও রাজনৈতিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। ২০১৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পূর্বে তাঁর বিরুদ্ধে রাজনৈতিকভাবে হয়রানি করতে পরপর ৭টি নাশকতার মিথ্যা মামলা দায়ের করা হয়।
বিএনপি করার অপরাধে গত ৪৮টি বছর ধরে খায়রুজ্জামান মধুর পুরো পরিবারের ওপর দিয়ে এক কঠিন রাজনৈতিক ঝড় বয়ে গেছে- শার্শা উপজেলা বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ পদে ভাই অবস্থান করার কারণে, ১৫তম বিসিএস ক্যাডার হিসেবে যোগদান করা সত্ত্বেও তাঁর ছোট বোনকে শুধুমাত্র রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা করে পদোন্নতি না দিয়ে অবসরে যেতে বাধ্য করা হয়।ছোট ছেলে ডাঃ তৌহিদুজ্জামান পলককে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে কোনো সরকারি বা বেসরকারি চাকরিতে যোগদানের সুযোগ দেওয়া হয়নি। তদুপরি চিহ্নিত সন্ত্রাসী ও বিরোধী গোষ্ঠীর একাধিক সশস্ত্র হামলায় তিনি মারাত্মকভাবে আহত হন এবং তাঁর ওপর দুই-দুই বার সরাসরি বোমা হামলা চালানো হয়। তাঁর ভাগ্নের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে একাধিকবার লুটপাট ও সশস্ত্র হামলা চালানো হয়। তাঁকে শারীরিকভাবে ব্যাপক নির্যাতন করে মৃত ভেবে ফেলে রেখে যাওয়া হয়।
কেবল রাজনীতিতেই নয়, সামাজিক ও ধর্মীয় অঙ্গনেও খায়রুজ্জামান মধু অত্যন্ত শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্ব। তিনি শার্শা উপজেলার সামাজিক ও ধর্মীয় ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা পালন করে আসছেন। তাঁর সততা, ন্যায়পরায়ণতা, দানশীলতা এবং বিপদগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মানসিকতা তাঁকে দল-মত নির্বিশেষে সমগ্র উপজেলার মানুষের কাছে অত্যন্ত গ্রহণযোগ্য এক জননেতায় পরিণত করেছে। আর এই জন্যই স্থানীয়রা আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে শার্শা উপজেলার সুযোগ্য চেয়ারম্যান হিসেবে তাঁকে পেতে চায়।
উপজেলার বাহাদুর ইউনিয়নের বিএনপির এক নেতা আবেগপ্লুত হয়ে বলেন, "মধু ভাই আমাদের গোটা উপজেলার গর্ব। উনার ত্যাগ বিএনপির জন্য বলে শেষ করা যাবে না। শার্শা উপজেলায় তিনি বিএনপির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। উনার মতো ত্যাগী নেতাদের এখন মূল্যায়নের সময় এসেছে। উনি যদি আমাদের উপজেলা চেয়ারম্যান হিসেবে আসেন, তাহলে ভেঙে পড়া শার্শা বিএনপি আবার চাঙ্গা হয়ে উঠবে।"
জনগণের আবেগ ও আসন্ন নির্বাচনে প্রার্থিতার বিষয়ে জনাব আলহাজ্ব খায়রুজ্জামান মধু বলেন, "আমি বিএনপির একজন ক্ষুদ্র কর্মী—এটাই আমার সবচেয়ে বড় পরিচয়। এলাকার মানুষের পাশে দল-মত নির্বিশেষে আমি শুরু থেকেই দাঁড়িয়ে আসছি। উপজেলা চেয়ারম্যান পদে নির্বাচন করার ইচ্ছে আমার অবশ্যই আছে, তবে সবকিছুই নির্ভর করছে আমার প্রাণের সংগঠন জেলা ও কেন্দ্রীয় বিএনপি হাইকমান্ডের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ওপর। দল যদি মনে করে এবং আমাকে মনোনয়ন দেয়, তবে আমি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করব। Areas মানুষের সেবা করার জন্য চেয়ারটা মুখ্য নয়, সৎ ইচ্ছাটাই আসল।"
আলহাজ্ব খায়রুজ্জামান মধু কেবল একজন রাজনৈতিক ব্যক্তি নন, বরং শার্শা উপজেলা বিএনপির ত্যাগ, সংগ্রাম ও দীর্ঘ পথচলার এক বিশ্বস্ত আলোকবর্তিকা। সাড়ে পাঁচ দশকের রাজনৈতিক জীবনে শত জুলুম-নির্যাতন, কারাবরণ ও পারিবারিক ক্ষতি সহ্য করেও তিনি দলের পতাকাকে এক মুহূর্তের জন্য নমিত হতে দেননি। দলের সিদ্ধান্ত যাই হোক না কেন, শার্শার রাজনীতিতে এবং সাধারণ মানুষের হৃদয়ে খায়রুজ্জামান মধুর নাম এক উজ্জ্বল ও অনুকরণীয় ইতিহাস হয়ে চিরকাল ভাস্বর থাকবে।