অভয়নগর প্রতিনিধি
যশোরের অভয়নগর উপজেলার নওয়াপাড়ার বহুল আলোচিত ফাতেমা প্রাইভেট হাসপাতালে প্রসূতি রত্না বেগমের মৃত্যুর অভিযোগকে কেন্দ্র করে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হয়েছে। অভিযানের একপর্যায়ে হাসপাতালটির অপারেশন থিয়েটার সিলগালা করার কার্যক্রম শুরু হয়। এ ঘটনায় হাসপাতাল এলাকায় উত্তেজনা ও থমথমে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। এর আগে হাসপাতালে প্রসূতি রত্না বেগমের মৃত্যুর পর তাঁর স্বজনেরা চিকিৎসায় গাফিলতি ও ভুল অপারেশনের অভিযোগ তুলে বিক্ষোভ করেন। এ সময় হাসপাতালের একজন চিকিৎসককে অবরুদ্ধ করে রাখার অভিযোগও ওঠে। পরে বিষয়টি নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।
স্বজনদের দাবি, প্রসবজনিত কারণে রত্না বেগমকে ফাতেমা প্রাইভেট হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে তাঁর অস্ত্রোপচার করা হয়। অস্ত্রোপচারের পর তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে থাকে। একপর্যায়ে তাঁর মৃত্যু হয়। স্বজনদের অভিযোগ, অস্ত্রোপচার ও পরবর্তী চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায় গাফিলতি ছিল। তাদের দাবি, যথাযথ চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হলে রোগীকে বাঁচানো সম্ভব হতে পারত।
তবে এসব অভিযোগের সত্যতা এখনো তদন্তে চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হয়নি। মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নির্ধারণে চিকিৎসা-সংক্রান্ত নথিপত্র, অস্ত্রোপচারের বিবরণ, চিকিৎসকদের দায়িত্ব পালন এবং প্রয়োজনীয় অন্যান্য বিষয় যাচাই করা জরুরি।
এ ঘটনায় আরও অভিযোগ উঠেছে, রোগীর মৃত্যুর পর স্বজনদের সঙ্গে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের একপর্যায়ে বসাবসি হয়। সেখানে তিন লাখ টাকার বিনিময়ে বিষয়টি আপস-মীমাংসা করে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে কথিত এই আপসের বিষয়ে কোনো লিখিত চুক্তি, অর্থ লেনদেনের প্রমাণ কিংবা সংশ্লিষ্ট পক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ফলে বিষয়টি অভিযোগ হিসেবেই উল্লেখ করা হচ্ছে। প্রশাসনিক তদন্তে এ ধরনের কোনো সমঝোতা হয়ে থাকলে তার প্রকৃতি ও বৈধতা স্পষ্ট হতে পারে।
প্রসূতির মৃত্যুর অভিযোগ ও পরবর্তী পরিস্থিতির মধ্যে প্রশাসনের পক্ষ থেকে ফাতেমা প্রাইভেট হাসপাতালে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হয়।
অভিযানের সময় হাসপাতালের বিভিন্ন বিষয় পরিদর্শন ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যাচাই করা হয় বলে জানা গেছে। একপর্যায়ে হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটার সিলগালা করার কার্যক্রম শুরু হয়। মোবাইল কোর্টের অভিযানকে কেন্দ্র করে হাসপাতালের সামনে স্থানীয় লোকজন ও রোগীর স্বজনদের ভিড় জমে যায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদেরও উপস্থিত থাকতে দেখা যায়।
নওয়াপাড়ার ফাতেমা প্রাইভেট হাসপাতালকে ঘিরে এর আগেও প্রসূতির মৃত্যুর অভিযোগ সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে আসমা বেগম নামে এক প্রসূতির মৃত্যুর ঘটনায় স্বজনেরা ভুল সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের অভিযোগ তুলেছিলেন। ওই ঘটনায় অস্ত্রোপচারের পর অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। এ ছাড়া ২০২৫ সালের জুনে একই হাসপাতালে ইতি বেগম নামে আরেক প্রসূতির মৃত্যুর ঘটনায় ভুল সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের অভিযোগ এবং তদন্ত কমিটি গঠনের তথ্যও একটি প্রতিবেদনে প্রকাশিত হয়েছিল। ফলে সর্বশেষ রত্না বেগমের মৃত্যুর অভিযোগের পর অপারেশন থিয়েটার সিলগালার ঘটনা স্থানীয়ভাবে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। প্রসূতির মৃত্যু চিকিৎসাজনিত জটিলতা, অস্ত্রোপচারের কোনো ত্রুটি, অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ, অ্যানেস্থেশিয়া-সংক্রান্ত জটিলতা কিংবা অন্য কোনো কারণে হয়েছে কি না, তা কেবল তদন্ত ও চিকিৎসা-সংক্রান্ত নথিপত্র পর্যালোচনার মাধ্যমেই নিশ্চিত হওয়া সম্ভব।
এ কারণে নিহতের স্বজনদের অভিযোগের পাশাপাশি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদের বক্তব্য গ্রহণ, রোগীর চিকিৎসা নথি যাচাই, অস্ত্রোপচারের বিবরণ পর্যালোচনা এবং প্রয়োজন হলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মতামত নেওয়ার দাবি উঠেছে।
স্থানীয়দেরও দাবি, শুধু একটি ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে নয়—নওয়াপাড়ার বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোর অনুমোদন, চিকিৎসক-নার্সের বৈধতা, অপারেশন থিয়েটারের মান, অ্যানেস্থেশিয়া ব্যবস্থা, জরুরি চিকিৎসা সুবিধা ও রোগীর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়মিতভাবে তদারকি করা হোক। এদিকে ফাতেমা প্রাইভেট হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বক্তব্য জানা গেলে তা প্রতিবেদনে যুক্ত করা হবে। প্রসূতি রত্না বেগমের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এবং হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কোনো চিকিৎসাগত বা প্রশাসনিক অনিয়ম ছিল কি না—প্রশাসনিক তদন্ত ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পরবর্তী পদক্ষেপেই তা স্পষ্ট হবে।