বিশেষ প্রতিনিধি, যশোর :
যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের বেলে বটতলা এলাকায় বহুল আলোচিত মাদক কারবারি রাবেয়া রাবির অত্যাচারে এলাকার মানুষ চরম অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, বিগত কয়েক বছর ধরে নিজ বাড়িতে প্রতিদিন সন্ধ্যায় মাদকের আসর বসিয়ে আসছেন সন্তানহীন এই নারী। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা মুসা মাহমুদের ছত্রছায়ায় প্রশাসনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে তিনি এই অবৈধ কর্মকাণ্ড চালিয়ে আসছিলেন।
অনুসন্ধানে জানা যায়, রাবেয়া রাবি প্রতিদিন আনুমানিক ৩ থেকে ৪ কেজি গাঁজা এবং প্রায় একশত পিস ইয়াবা বিক্রি করেন। গত ৫ই আগস্টের পর কিছুদিন তার এই মাদক ব্যবসা বন্ধ থাকলেও গত -৯ মাস ধরে তা আবারও দেদারসে চালু হয়েছে। স্থানীয়দের আরও গুরুতর অভিযোগ, তিনি তার মাদকের আড্ডায় মাদকসেবীদের জন্য উঠতি বয়সের মেয়ে সরবরাহ করে অনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে আসছেন।
এলাকার যুবসমাজকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাতে গত ৭ই আগস্ট ২০২৬ তারিখে ১ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর প্রার্থী জনাব মো. রাসেলের নেতৃত্বে এলাকার সুধী সমাজ ও সচেতন নাগরিকেরা রাবেয়া রাবির বাড়িতে গিয়ে মাদক কারবার বন্ধ করার অনুরোধ জানান। তাকে ব্যবসা গুটিয়ে নেওয়ার জন্য ৭ দিনের সময় বেঁধে দেওয়া হয় এবং এলাকা জুড়ে এক গণস্বাক্ষর অভিযান পরিচালনা করা হয়।
তবে সতর্ক করার সময় রাবেয়া রাবি ক্ষিপ্ত হয়ে এলাকাবাসীকে গালিগালাজ করেন এবং ইব্রাহিম হোসেন পচা নামক এক ব্যক্তির মাথায় ইট মেরে রক্তাক্ত করেন। এরপরও মুরুব্বিরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনে তাকে ৭ দিনের আলটিমেটাম দিয়ে আসেন।
স্থানীয়দের দাবি, আলটিমেটাম পেয়ে মাদক ব্যবসা বন্ধ করা তো দূরের কথা, উল্টো কাউন্সিলর প্রার্থী রাসেলকে হত্যা করার জন্য কিলার গ্রুপ ভাড়া করেন রাবেয়া রাবি। গত ১৩ ই আগস্ট বাজারে ঘাতক দলের উপস্থিতি টের পেয়ে রাসেল কোনোমতে প্রাণ বাঁচিয়ে বাসায় ফেরেন। এই খবর ছড়িয়ে পড়লে ১৪ ই আগস্ট বিক্ষুব্ধ এলাকাবাসী রাবেয়া রাবির বাড়ির ভেতরের মাদকের আড্ডাখানা ভেঙে গুঁড়িয়ে দেয়।
এর জের ধরে রাবেয়া রাবি যশোর জেলা আদালতে রাসেলসহ মোট ৬ জনকে আসামি করে একটি সিআর মামলা (মামলা নং: ৬৬৮/২০২৬) দায়ের করেন। মামলায় প্যানাল কোডের ১০৯, ৩০৭, ৩২৩, ৩৮৫, ৩৮৬, ৩৮৭, ৪৪৭ ও ৪৪৮ ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে। মামলা দায়েরের পর থেকে আসামিরা বর্তমানে গ্রেফতার আতঙ্কে আত্মগোপনে রয়েছেন।
মামলার প্রধান আসামি মো.রাসেল জানান, “এই মহিলা পুরো এলাকার যুবসমাজকে মাদকের মাধ্যমে ধ্বংস করে দিচ্ছে। বাসায় গাঁজা ও ইয়াবার আসরের পাশাপাশি অনৈতিক কাজ করানো হতো। ওয়ার্ডবাসীর পক্ষ থেকে ওয়ার্নিং দেওয়ার পরও তিনি শুধরাননি; উল্টো আমাকে হত্যার জন্য কিলার ভাড়া করেন। এতে এলাকাবাসী ক্ষিপ্ত হয়ে আড্ডাখানা ভেঙে দিলে তিনি আমাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা ঠুকে দেন।”
নাম প্রকাশ না করার শর্তে পৌর বিএনপির এক নেতা বলেন, “মহিলাটি অত্যন্ত প্রভাবশালী ও চতুর। বিগত সরকারের আমলে আওয়ামী লীগ নেতা মুসার সাথে সুসম্পর্ক রেখে তিনি এই মাদক সাম্রাজ্য চালিয়েছেন। এমনকি আওয়ামী আমলে তৎকালীন বিএনপির উপজেলা চেয়ারম্যান ও বর্তমান সংসদ সদস্য মহোদয়-এর সাথেও তিনি প্রকাশ্যে অসৌজন্যমূলক আচরণ করেছিলেন। তিনি সব সময় ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন। মাদকবিরোধী অবস্থান নেওয়ায় এখন সাধারণ মানুষকে মামলার ভয় দেখাচ্ছেন।”
ওয়ার্ড বিএনপির অপর এক নেতা বলেন, “সরকার যেখানে মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে, সেখানে এই নারীর কারণে এলাকার তরুণ সমাজ শেষ হয়ে যাচ্ছে। তিনি একেক সময় একেক দলের সাথে মিশে যাওয়ার চেষ্টা করেন। আমাদেরও ম্যানেজ করার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু পারেননি।”
অভিযোগের বিষয়ে জানতে রাবেয়া রাবির সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, “সব মিথ্যা। এলাকার মানুষ এক হয়ে আমার বিরুদ্ধে অসত্য তথ্য ছড়াচ্ছে এবং আমার ঘরবাড়ি ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছে।” এলাকার মানুষের স্বাক্ষর ও মাদক কারবারের বিষয়ে বিস্তারিত জানতে চাইলে তিনি অসুস্থতার অজুহাত দেখিয়ে বলেন, “আমি আর কথা বলতে পারছি না, যেকোনো সময় মাথা ঘুরে পড়ে যেতে পারি।”
এলাকাবাসীর দাবি, দ্রুত প্রশাসনিক তদন্তের মাধ্যমে এই মাদক সম্রাজ্ঞীর বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক এবং নির্দোষ স্থানীয়দের মিথ্যা মামলার হয়রানি থেকে মুক্তি দেওয়া হোক।