নিজস্ব প্রতিবেদক
অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী বাংলাদেশি নারী রেহানা পারভীনকে হত্যার পর তাঁর মরদেহ আশুলিয়ায় একটি সেপটিক ট্যাংকের পাশে মাটিচাপা দিয়ে ওপরে সবজির চারা লাগানোর অভিযোগ উঠেছে। প্রায় দুই বছর পর মামলার তদন্ত শেষে আদালতে দেওয়া অভিযোগপত্রে হত্যাকাণ্ড ও মরদেহ গুমের এমন চাঞ্চল্যকর বিবরণ উঠে এসেছে।
তদন্ত শেষে ঢাকার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে রেহানার স্বামী আওলাদ হোসাইনসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করেন তদন্ত কর্মকর্তা নবাবগঞ্জ থানার উপপরিদর্শক (এসআই) তানভীর হাসান খান। চার্জশিটভুক্ত অন্য আসামিরা হলেন, আওলাদের দুই বোন পাপিয়া আক্তার ও মাকসুদা বেগম, চাচাতো ভাই কবীর হোসাইন এবং চাচা আমজাদ হোসাইন। ঢাকার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট তানভীর আহমেদ অভিযোগপত্রটি দেখেছেন। আগামী ১৯ অক্টোবর এটি পর্যালোচনার পরবর্তী দিন ধার্য রয়েছে।
যেভাবে হত্যার অভিযোগ অভিযোগপত্রের বিবরণ অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৬ জুন ১৩ বছর বয়সী মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে অস্ট্রেলিয়া থেকে বাংলাদেশে আসেন রেহানা পারভীন। ২৯ জুন দেশে ফেরেন তাঁর স্বামী আওলাদ হোসাইন। তদন্তে উঠে এসেছে, বাংলাদেশ ও অস্ট্রেলিয়ায় থাকা সম্পত্তি এবং পারিবারিক বিরোধকে কেন্দ্র করে রেহানাকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়, এমনটাই অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। এরপর ২০২৪ সালের ৫ জুলাই সন্ধ্যার পর রেহানাকে আশুলিয়ার নয়ারহাট চৌরাপাড়ায় তাঁর ননদ পাপিয়া আক্তারের বাসায় নিয়ে যাওয়া হয়। চার্জশিটের তথ্য অনুযায়ী, সেখানে তর্কাতর্কির একপর্যায়ে রেহানাকে মেঝেতে ফেলে দেওয়া হয়। এরপর আমজাদ হোসাইন তাঁর পা এবং কবীর হোসাইন দুই হাত চেপে ধরেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে। পরে আওলাদ তাঁর পেটের ওপর বসে মুখে বালিশ চাপা দিয়ে শ্বাসরোধে হত্যা করেন বলে তদন্তে উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, হত্যার পর ওই রাতেই পাপিয়ার বাড়ির সামনে সেপটিক ট্যাংকের পাশে গর্ত খুঁড়ে রেহানার মরদেহ মাটিচাপা দেওয়া হয়। ঘটনা গোপন রাখতে মাটির ওপর সবজির চারা লাগানো হয়েছিল বলেও চার্জশিটে উল্লেখ করা হয়েছে। রেহানা নিখোঁজ হওয়ার পর তাঁর মা আইরিন আক্তার থানায় অপহরণ মামলা করেন। পরে তদন্তের একপর্যায়ে ২০২৪ সালের ১২ সেপ্টেম্বর আশুলিয়া থেকে মাটিচাপা দেওয়া অবস্থায় রেহানার গলিত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এরপর অপহরণ মামলাটি হত্যা ও মরদেহ গুমের মামলায় রূপ নেয়।
তিন আসামির স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি
মামলার তদন্তসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, গ্রেপ্তার হওয়া পাপিয়া আক্তার, কবীর হোসাইন ও আমজাদ হোসাইন আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। এ ছাড়া রেহানার নাবালিকা মেয়েও তাঁর বাবার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিয়েছে বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। অস্ট্রেলিয়ায় আওলাদ গ্রেপ্তার
হত্যাকাণ্ডের পর রেহানার স্বামী আওলাদ হোসাইন অস্ট্রেলিয়ায় চলে যান বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
তদন্ত কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, বর্তমানে আওলাদ অস্ট্রেলিয়ার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে রয়েছেন। বাংলাদেশের পুলিশ কর্মকর্তাদের ঘুষ দিয়ে মামলায় নিজের নাম বাদ দেওয়া এবং তদন্ত প্রভাবিত করার জন্য ৯০ হাজার অস্ট্রেলিয়ান ডলার পাঠানোর অভিযোগেও তাঁকে অস্ট্রেলিয়ান ফেডারেল পুলিশ (এএফপি) ব্রিসবেন থেকে গ্রেপ্তার করেছে বলে সংশ্লিষ্ট নথিতে উল্লেখ রয়েছে। এ ছাড়া ভুয়া মৃত্যু সনদ ব্যবহার করে রেহানার অস্ট্রেলিয়ায় থাকা সম্পত্তি আত্মসাতের অভিযোগেও আওলাদের বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে বলে জানানো হয়েছে। তদন্ত কর্মকর্তার তথ্য অনুযায়ী, আওলাদকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনতে ইন্টারপোলের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
পাঁচজনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র
মামলায় অভিযুক্ত আমজাদ হোসাইন ও কবীর হোসাইন বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন। অন্যদিকে পাপিয়া আক্তার ও মাকসুদা বেগম জামিনে আছেন।
তদন্ত শেষে স্বামী আওলাদ হোসাইনসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়েছে। আগামী ১৯ অক্টোবর অভিযোগপত্র পর্যালোচনার দিন ধার্য রয়েছে।
তবে অভিযোগপত্রে উঠে আসা এসব তথ্য এখনো আদালতে বিচারিকভাবে প্রমাণিত হয়নি। মামলার পরবর্তী বিচারিক কার্যক্রমে সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতেই অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারিত হবে।