নিজস্ব প্রতিবেদক
যশোরের মণিরামপুরে বন্ধুর সঙ্গে স্ত্রীর বিয়ের ১২ দিন পর মিথুন হোসেন (২৮) নামে এক যুবকের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। রোববার দিবাগত রাত ১১টার দিকে উপজেলার কাশিমনগর ইউনিয়নের মান্দারতলা এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।
নিহত মিথুন ওই এলাকার মশিয়ার রহমানের ছেলে। তিনি পেশায় নির্মাণশ্রমিক ছিলেন। তাঁর ছয় ও চার বছর বয়সী দুই ছেলে রয়েছে। স্বজনদের অভিযোগ, স্ত্রী সাথীর সঙ্গে মালয়েশিয়াপ্রবাসী বন্ধু সুমনের ঘনিষ্ঠতার বিষয়টি জানার পর মিথুন নিজে উপস্থিত থেকে সাথীর সঙ্গে সুমনের বিয়ে দেন। এরপর থেকেই তিনি মানসিক ও পারিবারিক চাপে ছিলেন। তবে পরিবারের কয়েকজন সদস্য মিথুনের মৃত্যুকে আত্মহত্যা হিসেবে মেনে নিতে নারাজ। তাঁদের দাবি, সাথী ও সুমনের কারণে মিথুনের মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে। পুলিশ বলছে, মরদেহে কোনো আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। এ ঘটনায় থানায় একটি অপমৃত্যুর মামলা হয়েছে। বন্ধুত্ব থেকে স্ত্রীর সঙ্গে পরিচয়
সোমবার স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রায় ১০ বছর আগে একই উপজেলার মধুপুর গ্রামের সাথীর সঙ্গে পারিবারিকভাবে বিয়ে হয় মিথুনের। তাঁদের সংসারে দুই ছেলে রয়েছে।
মিথুনের বন্ধু ও প্রতিবেশী সুমনের সঙ্গে তাঁর ছোটবেলা থেকেই পরিচয় ছিল। সেই সূত্রে সাথীর সঙ্গেও সুমনের পরিচয় হয়। প্রায় চার বছর আগে সুমন মালয়েশিয়ায় চলে যান। পরে দেশে ফিরে কয়েক দিন অবস্থানের পর প্রায় তিন মাস আগে তিনি আবার মালয়েশিয়ায় যান। স্থানীয়দের ভাষ্য, একপর্যায়ে সুমনের সঙ্গে সাথীর ঘনিষ্ঠতার বিষয়টি জানতে পারেন মিথুন। স্ত্রীকে বোঝানোর চেষ্টা করেও পরিস্থিতির পরিবর্তন না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত তিনি নিজেই সাথীকে সুমনের সঙ্গে বিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেন। স্থানীয়দের দাবি, একটি কাজী অফিসে নিয়ে মিথুনের উপস্থিতিতেই সাথী ও সুমনের বিয়ে হয়।
‘মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন মিথুন’
মিথুনের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও পল্লিচিকিৎসক মুবাসসের আল মুবিন বলেন, তিন দিন আগে তাঁর সঙ্গে মিথুনের দেখা হয়েছিল। তখন তাঁকে মানসিকভাবে ভেঙে পড়া অবস্থায় দেখেন তিনি। মুবাসসের আল মুবিনের ভাষ্য, একটি নম্বরে ফোন করে মিথুনকে কান্নাকাটি করতে ও ক্ষমা চাইতে দেখেছিলেন তিনি। বিষয়টি জানতে চাইলে মিথুন তাঁকে জানান, তিনি নিজে উপস্থিত থেকে স্ত্রীকে অন্যত্র বিয়ে দিয়েছেন।
মিথুন আরও জানিয়েছিলেন, সুমন তাঁর পরিচিত এবং সম্পর্কে চাচাতো ভাই। পারিবারিকভাবে বিভিন্ন ধরনের চাপের মধ্যে ছিলেন তিনি। দুই সন্তানের ভবিষ্যতের কথা ভেবেই স্ত্রীকে অন্যত্র বিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন বলে মিথুন তাঁকে জানিয়েছিলেন। ছেলেকে হত্যা করে ঝুলিয়ে রাখা হয়ে থাকতে পারে নিহতের মা রওশনারা বলেন, তাঁরা আগে এসব বিষয় জানতেন না। তাঁর দাবি, ছেলে দীর্ঘদিন ধরে মানসিক চাপে ছিলেন।
রওশনারার ভাষ্য, রোববার রাতে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ঝগড়া হয়। কিছুক্ষণ পর সাথী এসে তাঁদের জানান, মিথুন আত্মহত্যা করেছেন। তবে ছেলের মৃত্যুকে স্বাভাবিক আত্মহত্যা হিসেবে মানতে নারাজ রওশনারা। তাঁর অভিযোগ, মিথুনকে হত্যা করে পরে ঝুলিয়ে রাখা হয়ে থাকতে পারে। তিনি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার দাবি করেন।
সাথীর দাবি, ‘মিথুনই বিয়েতে রাজি করান’
নিহতের পরিবারের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সাথী। তাঁর দাবি, মিথুন নিজেই সুমনকে ফোন করে স্ত্রী ও সন্তানদের দায়িত্ব নেওয়ার অনুরোধ করেছিলেন। সাথীর ভাষ্য, প্রথমে সুমন রাজি না হলেও পরে মিথুনের চাপে রাজি হন। গত ১৪ সেপ্টেম্বর মিথুন তাঁকে শরীর ছুঁয়ে শপথ করিয়ে সুমনকে বিয়ে করতে রাজি করান। পরে ১৬ সেপ্টেম্বর নওয়াপাড়ার ধোপাদি এলাকার একটি কাজী অফিসে নিয়ে সুমনের সঙ্গে তাঁর বিয়ে দেওয়া হয়। সাথীর দাবি, ওই বিয়ের কাগজে মিথুন সাক্ষী হিসেবেও স্বাক্ষর করেছিলেন।
তিনি আরও বলেন, রোববার রাতে এসব বিষয় নিয়ে তাঁদের মধ্যে কথাকাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে মিথুন আত্মহত্যা করেন।নসুমন বর্তমানে বিদেশে থাকায় তাঁর সরাসরি বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে তাঁর ভগ্নিপতি রাকিব হোসেন বলেন, মিথুনের মৃত্যুর পর তাঁরা বিষয়টি জানতে পারেন।
রাকিবের ভাষ্য, পরে সুমনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি সাথীর সঙ্গে বিয়ের বিষয়টি অস্বীকার করেন। মিথুন ও সুমনের মধ্যে বন্ধুত্বের সম্পর্ক ছিল বলেও জানান তিনি। মিথুনের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় লোকজন তাঁর বাড়িতে ভিড় করেন। এক প্রতিবেশীর ভাষ্য, ওই সময় সাথী একটি ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দেন। পরে দরজা খুলে তাঁকে বাইরে আনা হয়। ঘটনাটি নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে নানা আলোচনা ও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে স্ত্রীর সঙ্গে বন্ধুর বিয়ে এবং এর মাত্র ১২ দিন পর মিথুনের মৃত্যুর বিষয়টি নিয়ে এলাকায় কৌতূহল তৈরি হয়েছে।
মণিরামপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবু সাঈদ বলেন, আত্মহত্যার খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করে মর্গে পাঠিয়েছে। মরদেহে কোনো আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি।
ওসি জানান, মিথুনের স্ত্রীর আরেকটি বিয়ের বিষয়টি পুলিশ জানতে পেরেছে। পরিবার চাইলে আত্মহত্যার প্ররোচনার অভিযোগে মামলা করতে পারে। তবে এখন পর্যন্ত নিহতের পরিবার কোনো এজাহার দেয়নি। তিনি বলেন, এ ঘটনায় থানায় একটি অপমৃত্যুর মামলা হয়েছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনসহ তদন্তের পর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যাবে।