বিশেষ প্রতিনিধি, চৌগাছা (যশোর):
যশোরের চৌগাছা উপজেলার ১০ নম্বর নারায়ণপুর ইউনিয়নে নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের পদধারী এক নেতাকে বিএনপির সক্রিয় কর্মী হিসেবে দাবি করে স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনকে বেকায়দায় ফেলার অপচেষ্টার অভিযোগ উঠেছে। ঘটনাটিকে ঘিরে থানা পুলিশ ও স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীদের মুখোমুখি অবস্থানে সচেতন নাগরিক সমাজ ও তৃণমূল রাজনীতিতে তীব্র ক্ষোভ ও মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে।
সরেজমিনে তদন্ত ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, গত ১লা অক্টোবর সকাল আনুমানিক ১১টার দিকে চৌগাছা থানা পুলিশের বিশেষ অভিযানে নারায়ণপুর ইউনিয়নের গোয়াখালী গ্রাম থেকে ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের ৪৬ নম্বর সদস্য মোঃ রবিউল ইসলাম কে আটক করা হয়। রবিউল ইসলাম আটক হওয়ার পর থেকেই ঘটনা মোড় নিতে শুরু করে ভিন্ন খাতে।
গত ৩ অক্টোবর নারায়ণপুর ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি মো. তরিকুল ইসলাম ডাবলুর স্বাক্ষরে রবিউলের অনুকূলে একটি প্রত্যয়নপত্র ইস্যু করা হয়, যেখানে তাকে বিএনপির সক্রিয় কর্মী হিসেবে দাবি করা হয়। পরবর্তী সময়ে উপজেলা বিএনপির সভাপতি এম এ সালাম ও ইউনিয়ন সভাপতি তরিকুল ইসলাম ডাবলুর যৌথ স্বাক্ষরিত আরও একটি প্রত্যয়নপত্র প্রদান করা হয়। সেখানে উল্লেখ করা হয়— রবিউল বিএনপির নিয়মিত কর্মী এবং তিনি দলের বিভিন্ন মিছিল-মিটিংয়ে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন।
শুধু প্রত্যয়নপত্র দিয়েই ক্ষান্ত হননি রবিউলের স্বজন ও স্থানীয় কিছু গোষ্ঠী। ওই প্রত্যয়নপত্র সংযুক্ত করে চৌগাছা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মামুনুর রশিদসহ কয়েকজন পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে খুলনা রেঞ্জের ডিআইজির কাছে একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন রবিউলের ছেলে আলামিন। এ ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও সচেতন মহলে ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়।
তবে অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে ভিন্ন চিত্র। সংগৃহীত নথিপত্র ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, আটককৃত রবিউল ইসলাম প্রকৃতপক্ষে ১০ নম্বর নারায়ণপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের ২০১৩ সালের কমিটির একজন সক্রিয় কর্মী এবং ওই কমিটির ৪৬ নম্বর সদস্য। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আওয়ামী লীগের সেই পূর্ণাঙ্গ কমিটির তালিকা ফাঁস হওয়ার পর থেকেই বিএনপির ত্যাগী কর্মী ও স্থানীয়দের মনে নানা প্রশ্নের উদ্রেক হয়েছে— একজন চিহ্নিত আওয়ামী লীগ নেতা কীভাবে রাতারাতি 'বিএনপি কর্মী' বনে গেলেন? ইউনিয়ন ও উপজেলা বিএনপির শীর্ষ দায়িত্বশীলরা কীভাবে তাকে প্রত্যয়নপত্র দিলেন?
ঘটনা সম্পর্কে প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে চৌগাছা উপজেলার প্রবীণ বিএনপি নেতা ইউনুস দফাদার ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "যারা এই কাজটি করেছে, তারা কি কোনোদিন ধানের শীষে ভোট দিয়েছে? দেয় নাই। এরা সবসময় এই ধরনের অন্যায় কাজ আর আকাম-কুকাম করে অবৈধভাবে টাকা-পয়সা কামায়। কিন্তু দুঃখের বিষয়, এত কিছুর পরেও এদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয় না।"
এ বিষয়ে যশোর জেলা বিএনপির সভাপতি সৈয়দ সাবেরুল হক সাবু কঠোর অবস্থান ব্যক্ত করে বলেন, "আমার কাছেও প্রথমে ওসির বিরুদ্ধে ভিন্ন অভিযোগ এসেছিল। এখন শুনছি পুরো উল্টো কথা। দলের পরিচয় ভাঙিয়ে এভাবে সুবিধাবাদীদের আশ্রয় দেওয়া খুবই লজ্জাজনক ও ন্যাক্কারজনক কাজ। ঘটনার সত্যতা যাচাই করে এর সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আমরা দ্রুত যথাযথ সাংগঠনিক পদক্ষেপ নেব।"
বিষয়টি নিয়ে চৌগাছা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মামুনুর রশিদ জানান, "আমরা সম্পূর্ণ নিয়মতান্ত্রিক ও পেশাদার উপায়ে আমাদের কাজ করেছি। বিশেষ অভিযানে তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে এবং তদন্তে স্পষ্ট প্রমাণিত যে তিনি আওয়ামী লীগের পদধারী নেতা।"
অন্যদিকে এক পুলিশ সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে আফসোস করে বলেন, "ভাই, আমরা চরম বিপদে আছি। আওয়ামী লীগের তালিকাভুক্ত আসামিদের ধরতে গেলেও বিপদ, আবার না ধরলেও বিপদ।"
তবে অভিযুক্ত রবিউলকে প্রত্যয়নপত্র দেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করে নারায়ণপুর ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি মো. তরিকুল ইসলাম ডাবলু দাবি করেন, "রবিউল ২০১৩ সালে ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের কমিটিতে ছিলেন, যা ২০১৫ সালে বিলুপ্ত হয়ে যায়। বর্তমানে ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের ৮ সদস্যের একটি কমিটি রয়েছে। রবিউল দীর্ঘদিন ধরে আমাদের সাথে কাজ করছেন এবং নির্বাচনে ভূমিকা রেখেছেন, তাই তাকে প্রত্যয়নপত্র দিয়েছি।" তবে ডিআইজির কাছে ওসির বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগের বিষয়ে কিছু জানেন না দাবি করে তিনি উল্টো অভিযোগ করেন, "এই নাটকের পেছনে চৌগাছার এক আওয়ামী লীগ ব্যবসায়ী জড়িত। তাছাড়া ওসি মামুন বড় বড় আওয়ামী লীগ নেতাদের না ধরে চুনোপুঁটিদের ধরছেন, যা দুঃখজনক।"
উপজেলা ও ইউনিয়নের শীর্ষ নেতাদের এমন ভূমিকা নিয়ে তৃণমূল বিএনপি নেতাকর্মীদের মধ্যে চরম অসন্তোষ বিরাজ করছে। বিতর্কিত ব্যক্তির রাজনৈতিক পরিচয় গোপন করে পুলিশকে হয়রানি করার এমন চক্রান্তের সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করেছেন যশোরের সুশীল সমাজ ও ত্যাগী রাজনীতিকেরা।