
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রায় চার দশক ধরে অমীমাংসিত থাকা এক রহস্যজনক হত্যাকাণ্ডের জট খুলতে শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায়। ১৯৮৭ সালে নিজ বাড়িতে খুন হওয়া ২০ বছর বয়সী মেলিসা ‘মিসি’ টেলর এলিসনের হত্যার দায় ৩৮ বছর পর পুলিশের কাছে ফোন করে স্বীকার করেছেন ৭০ বছর বয়সী গ্যারি গ্লোওয়াচ। মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) সিএনএনের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
ঘটনাটি ঘটে ১৯৮৭ সালের ২৮ ডিসেম্বর। ফ্লোরিডার জ্যাকসনভিলে নিজের শোবার ঘরে মেলিসার মরদেহ দেখতে পান তার দুই রুমমেট। পাশের ঘরে তখন কাঁদছিল তার মাত্র ১৩ মাস বয়সী শিশুকন্যা ক্যাসি। ময়নাতদন্তে জানা যায়, মাথায় ভোঁতা কোনো বস্তু দিয়ে আঘাত করে মেলিসাকে হত্যা করা হয়েছিল।
তবে দীর্ঘ তদন্তের পরও সে সময় খুনের সঙ্গে জড়িত কাউকে শনাক্ত বা গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। ফলে মামলাটি ধীরে ধীরে একটি ‘কোল্ড কেস’-এ পরিণত হয়। ৩৮ বছর পর নিজেই পুলিশের দ্বারস্থ
দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটে চলতি বছরের ৮ জুলাই। ওই দিন ক্লে কাউন্টি শেরিফের কার্যালয়ে ফোন করেন গ্যারি গ্লোওয়াচ। তিনি জানান, বহু বছর আগের একটি অপরাধ সম্পর্কে তিনি ‘সবকিছু পরিষ্কার’ করতে চান। পরে জ্যাকসনভিল শেরিফের গোয়েন্দাদের কাছে জিজ্ঞাসাবাদে তিনি ১৯৮৭ সালের হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করেন।
গ্রেপ্তারি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঘটনার সময় গ্লোওয়াচের বয়স ছিল ৩২ বছর। মাদক কেনার টাকা জোগাড় করতে তিনি মেলিসার বাড়িতে চুরি করতে ঢুকেছিলেন। গ্লোওয়াচের ভাষ্য অনুযায়ী, জানালা দিয়ে বাড়িতে ঢোকার পর তিনি দেখতে পান মেলিসা তার শিশুসন্তানকে নিয়ে ঘুমিয়ে আছেন। এ সময় ঘরে থাকা একটি কাঠের গুঁড়ি দিয়ে তিনি মেলিসার মাথায় আঘাত করেন। এরপর শিশুটিকে কোলে নিয়ে পাশের ঘরের সোফায় রেখে আসেন তিনি। পরে বিছানার নিচে টাকা খুঁজতে থাকেন।
পুলিশের কাছে ফাঁস করলেন গোপন তথ্য
গ্লোওয়াচের স্বীকারোক্তিকে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে তার দেওয়া কিছু তথ্য। তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, তিনি ঘটনাস্থল সম্পর্কে এমন কিছু সূক্ষ্ম বিবরণ দিয়েছেন, যা এত বছরেও জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়নি। এ কারণে তার স্বীকারোক্তির সত্যতা নিয়ে তদন্তকারীরা যথেষ্ট আশ্বস্ত হয়েছেন।
গ্লোওয়াচ দাবি করেছেন, চলতি বছরের মার্চে একটি প্রতিবেদন পড়ার পর তিনি বুঝতে পারেন—৩৮ বছর আগে তার দেওয়া সেই আঘাতেই মেলিসার মৃত্যু হয়েছিল। এত বছর তিনি জানতেন না যে, ওই হামলার পর মেলিসা মারা গেছেন।
মায়ের খুনের বিচার দেখার অপেক্ষায় ছিলেন মেয়ে
মেলিসার মৃত্যুর সময় তার মেয়ে ক্যাসি এলিসনের বয়স ছিল মাত্র ১৩ মাস। এখন তিনি চল্লিশোর্ধ্ব নারী। মায়ের হত্যার রহস্যের সমাধানের অপেক্ষায় দীর্ঘ সময় কাটিয়েছেন তিনি ও তার পরিবার।
২০১৯ সালে মেলিসার মা ক্যাথরিন টেলর মেয়ের হত্যাকারীর পরিচয় না জেনেই মারা যান।
২০১৮ সালে মামলাটি ‘প্রজেক্ট: কোল্ড কেস’ নামের একটি অলাভজনক সংগঠনের হাতে তুলে দেওয়া হয়। এরপর চলতি বছরের জানুয়ারিতে সংগঠনটি ও মেলিসার পরিবার খুনিকে শনাক্ত করতে জনসাধারণের সহায়তা চেয়ে সংবাদ সম্মেলন করে।
জ্যাকসনভিল শেরিফের কার্যালয় জানিয়েছে, ওই সংবাদ সম্মেলনের পর পাওয়া তথ্য এবং গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনই শেষ পর্যন্ত গ্লোওয়াচকে পুলিশের কাছে নিজের অপরাধ স্বীকার করতে উদ্বুদ্ধ করে। জামিন ছাড়াই কারাগারে, বর্তমানে গ্যারি গ্লোওয়াচকে দ্বিতীয়-ডিগ্রি হত্যা এবং সশস্ত্র চুরির অভিযোগে ডুভাল কাউন্টি জেলে জামিন ছাড়াই আটক রাখা হয়েছে। অপরাধী শনাক্ত ও গ্রেপ্তার হলেও মেলিসার পরিবারের কাছে এখনো মনে হচ্ছে না যে তাদের দীর্ঘ প্রতীক্ষার পুরোপুরি অবসান হয়েছে। তবে ৩৮ বছর পর অন্তত মায়ের হত্যার পেছনে থাকা ব্যক্তির পরিচয় সামনে আসায় তাদের দীর্ঘ শোক ও অপেক্ষার অধ্যায়ে নতুন একটি মোড় এসেছে। প্রায় চার দশক ধরে যে প্রশ্নের উত্তর খুঁজছিল একটি পরিবার, মেলিসাকে কে হত্যা করেছিল?, অবশেষে সেই প্রশ্নের উত্তর মিলেছে খুনির নিজের মুখেই।