
মোঃ কামাল হোসেন
যশোরের অভয়নগরে মাদকবিরোধী অভিযান চলছে, উদ্ধার হচ্ছে ইয়াবা, গাঁজা ও অন্যান্য মাদক; গ্রেপ্তারও হচ্ছেন কথিত কারবারিরা। কিন্তু অভিযান ও আটকের পরও মাদকের বিস্তার যেন থামছে না। বরং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ এড়িয়ে ভিন্ন কৌশলে মাদক সরবরাহের অভিযোগ উঠছে। ফলে গ্রাম থেকে শহরের অলিগলি, বিভিন্ন বয়সী মানুষের মধ্যে মাদকের ছোবল নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিশেষ করে ইয়াবাকে কেন্দ্র করে একটি শ্রেণির তরুণের মধ্যে নেশার প্রবণতা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। নেশার টাকা জোগাড় করতে কেউ ঘরের আসবাবপত্র বিক্রি করছে, কেউ পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে টাকা ছিনিয়ে নিচ্ছে। আবার কেউ কেউ চুরি, ছিনতাইসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, নেশার টাকা না পেয়ে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার এবং মা-বাবার ওপর শারীরিকভাবে হামলার মতো ঘটনাও ঘটছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। একসময় যে সন্তান মা-বাবার আশ্রয় ও ভরসার জায়গা ছিল, মাদকের নেশায় সেই সন্তানই পরিবারের আতঙ্কে পরিণত হচ্ছে, এমন অভিযোগ এখন অনেক পরিবারের। অভিযানে ইয়াবা উদ্ধার, তবুও কমছে না সরবরাহ। অভয়নগরে মাদকবিরোধী অভিযানের ধারাবাহিকতায় বিভিন্ন সময়ে ইয়াবা উদ্ধারের খবর পাওয়া গেছে। চলতি বছরের মে মাসে অভয়নগরের শুভরাড়া ইউনিয়নের ইছামতি গ্রামের গলাচিপা মোড় থেকে ৪০০ পিস ইয়াবাসহ দুই ব্যক্তিকে আটকের ঘটনা ঘটেছে। চলতি মাসে ওই ইউনিয়ন থেকে ১৭ কেজি গাঁজাসহ তিনজনকে আটক করা হয়েছে। এর আগে ৩০ জুন নওয়াপাড়া পৌর এলাকার একটি স্থানে অভিযান চালিয়ে ৯০ পিস ইয়াবাসহ একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে হয়েছে। চলতি মাসে নওয়াপাড়া মডেল কলেজ রোডের ভাড়া বাসা থেকে ১৪১৭ পিস ইয়াবাসহ দুইজনকে আটক করা হয়েছে। এসব ঘটনা থেকে স্পষ্ট, অভয়নগরে মাদকবিরোধী অভিযান একেবারে নিষ্ক্রিয় নয়। বরং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে। কিন্তু স্থানীয়দের প্রশ্ন, এত অভিযান ও মামলা-গ্রেপ্তারের পরও মাদকের সরবরাহ কীভাবে অব্যাহত থাকছে?
নারীরাও জড়াচ্ছে মাদক কারবারে
মাদক ব্যবসার সঙ্গে শুধু পুরুষ নয়, নারীদের সম্পৃক্ততার ঘটনাও সামনে আসছে। চলতি বছরের এপ্রিলে নওয়াপাড়া পৌরসভার বুইকারা এলাকায় ১৫০ পিস ইয়াবাসহ এক নারীকে আটক হয়েছিলো।
এছাড়া যশোর জেলায় চলতি বছর একাধিক অভিযানে নারী মাদক কারবারি আটকের খবরও এসেছে। ফেব্রুয়ারিতে ১ হাজার পিস এবং মার্চে ২ হাজারের বেশি ইয়াবাসহ নারী আটকের তথ্য প্রকাশ করেছে ইউএনবি। মাদক কারবারিদের একটি অংশ বড় চালান এনে বিভিন্ন স্তরে ভাগ করে খুচরা বিক্রির মাধ্যমে বাজারে ছড়িয়ে দিচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। সরাসরি বড় পরিমাণ মাদক বহনের পরিবর্তে ছোট ছোট চালান, পরিচিতজনের মাধ্যমে সরবরাহ, নির্দিষ্ট স্থানে অল্প সময়ের জন্য অবস্থান এবং মোবাইল যোগাযোগের মাধ্যমে ক্রেতার কাছে পৌঁছে দেওয়ার মতো কৌশল ব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে। যশোরে বড় চালান উদ্ধারের ঘটনাও ঘটেছে। গত জুলাইয়ে শহরতলীর ঝুমঝুমপুর এলাকায় অভিযান চালিয়ে একটি প্রাইভেটকার থেকে ৩০ হাজার পিস ইয়াবা উদ্ধার করা হয়
অর্থাৎ, স্থানীয় পর্যায়ে খুচরা বিক্রেতা ধরা পড়লেও এর পেছনের সরবরাহকারী, অর্থের উৎস ও বড় নেটওয়ার্ক শনাক্ত করা না গেলে মাদকের বাজার পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। মাদক শুধু একজনকে নয়, ধ্বংস করছে পুরো পরিবারকে।
মাদকাসক্তির সবচেয়ে ভয়াবহ প্রভাব পড়ে পরিবারে। নেশাগ্রস্ত ব্যক্তি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক কর্মজীবন ও সামাজিক সম্পর্ক থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে পারেন। অর্থের সংকট তৈরি হলে পরিবারের সম্পদ বিক্রি, ঋণগ্রহণ কিংবা অপরাধে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিও বাড়ে। ফলে মাদকের বিরুদ্ধে শুধু অভিযান পরিচালনা করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। প্রয়োজন একসঙ্গে সরবরাহ বন্ধ, মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা, মাদকাসক্তদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসন এবং পরিবার-সমাজভিত্তিক সচেতনতা কার্যক্রম। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের দায়িত্বের মধ্যেও অবৈধ মাদকের প্রবাহ রোধের পাশাপাশি মাদকাসক্তদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসন এবং জনসচেতনতা তৈরির বিষয়টি রয়েছে।
প্রশ্ন উঠছে, খুচরা বিক্রেতা’ নয়, মূল হোতারা কোথায়?
স্থানীয়দের দাবি, অভিযানে মাঝেমধ্যে মাদকসহ ব্যক্তিরা আটক হলেও মাদকের মূল উৎস, অর্থের জোগানদাতা ও বড় কারবারিদের বিরুদ্ধে আরও গভীর তদন্ত প্রয়োজন। একই সঙ্গে যেসব এলাকায় বারবার মাদক উদ্ধারের ঘটনা ঘটছে, সেসব স্থানকে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করে নজরদারি বাড়ানোর দাবি উঠেছে। সচেতন মহলের মতে, মাদকবিরোধী অভিযানকে শুধু গ্রেপ্তার ও উদ্ধারকেন্দ্রিক না রেখে ‘সাপ্লাই চেইন’ ভেঙে দেওয়ার দিকে নজর দিতে হবে। পাশাপাশি মাদকাসক্ত তরুণদের অপরাধী হিসেবে দূরে ঠেলে না দিয়ে চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের আওতায় আনার উদ্যোগও জরুরি। কারণ একটি ইয়াবা শুধু একজন তরুণকে নষ্ট করে না, তার সঙ্গে ধ্বংস হতে পারে একটি পরিবার, একটি ভবিষ্যৎ এবং শেষ পর্যন্ত একটি পুরো প্রজন্ম। অভয়নগরবাসীর প্রত্যাশা, মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান আরও জোরদার হবে, ছোট কারবারির পাশাপাশি চিহ্নিত হবে মূল হোতারা; একই সঙ্গে মাদকাসক্তদের ফিরিয়ে আনার জন্য কার্যকর চিকিৎসা ও পুনর্বাসন ব্যবস্থা গড়ে উঠবে।