
নিজস্ব প্রতিবেদক
নড়াইল সদর সহকারী কমিশনার (ভূমি) কার্যালয়ের চেইনম্যান মো. সবুর শেখ কামালের বিরুদ্ধে জমির বিরোধ মীমাংসার কথা বলে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা ঘুষ নেওয়া এবং পরবর্তীতে সেই অর্থের ৭০ হাজার টাকা ফেরত না দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। পাওনা টাকা ফেরতের দাবিতে ভুক্তভোগী সাংবাদিকদের কাছে লিখিত অভিযোগ ও সংবাদ সম্মেলন করার পর এবার ভুক্তভোগী ও সংশ্লিষ্ট সাক্ষীদের বিরুদ্ধে নড়াইল সদর থানায় অভিযোগ করেছেন ওই চেইনম্যান। এতে ঘটনাটি নিয়ে নতুন করে নানা প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। ভুক্তভোগী মো. হাফিজ মোল্লা যশোরের অভয়নগর উপজেলার সিংগাড়ী গ্রামের মৃত মোন্তাইন মোল্লার ছেলে। তাঁর অভিযোগ, ২০২৫ সালের জুন মাসে জমি সংক্রান্ত বিরোধ সমাধান করে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে নড়াইল সদর সহকারী কমিশনার (ভূমি) কার্যালয়ের চেইনম্যান মো. সবুর শেখ কামাল তাঁর কাছ থেকে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা নেন।
তবে টাকা নেওয়ার পরও কথিত জমির বিরোধের কোনো সমাধান হয়নি। একপর্যায়ে হাফিজ মোল্লা নড়াইলের সাংবাদিক স্বপনের মাধ্যমে বিষয়টি উত্থাপন করেন। এরপর পরিস্থিতি সামাল দিতে সবুর শেখ কামাল ১ লাখ ২০ হাজার টাকার মধ্যে ৫০ হাজার টাকা ফেরত দেন এবং অবশিষ্ট ৭০ হাজার টাকা এক মাসের মধ্যে পরিশোধ করবেন বলে প্রতিশ্রুতি দেন বলে ভুক্তভোগীর দাবি। কিন্তু সেই এক মাস পার হলেও দীর্ঘদিন ধরে পাওনা ৭০ হাজার টাকা ফেরত দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেন হাফিজ মোল্লা। বারবার টাকা চেয়েও কোনো সমাধান না পেয়ে শেষ পর্যন্ত তিনি সাংবাদিকদের কাছে লিখিত অভিযোগ করেন। সংবাদ প্রকাশের পর পরিস্থিতি আরও জটিল ভুক্তভোগীর লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে বিভিন্ন প্রিন্ট ও অনলাইন মাধ্যমে চেইনম্যান সবুর শেখ কামালের বিরুদ্ধে অভিযোগসংক্রান্ত সংবাদ প্রকাশিত হয়। ভুক্তভোগীর দাবি, সংবাদ প্রকাশের পর থেকেই তিনি ও পাওনা টাকা সংক্রান্ত বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সাক্ষীরা বিভিন্নভাবে হুমকি ও চাপের মুখে পড়ছেন। এ অবস্থায় গত ৯ আগস্ট হাফিজ মোল্লা যশোরের অভয়নগর প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে তাঁর পাওনা ৭০ হাজার টাকা ফেরত এবং বিষয়টির সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করেন। ভুক্তভোগীর দাবি, সংবাদ সম্মেলনের পরই ঘটনাটি ভিন্ন খাতে নেওয়ার উদ্দেশ্যে চেইনম্যান সবুর শেখ কামাল তাঁদের বিরুদ্ধে নড়াইল সদর থানায় একটি মনগড়া ও মিথ্যা অভিযোগ করেছেন।
‘অভিযোগ সত্য হলে এতদিন নীরব ছিলেন কেন?’
ভুক্তভোগী ও তাঁর পক্ষের লোকজনের প্রশ্ন, চেইনম্যান সবুর শেখ কামালের থানায় দেওয়া অভিযোগে যেসব ঘটনার কথা বলা হয়েছে, সেগুলো যদি সত্যিই ঘটে থাকে, তাহলে তিনি তখনই কেন তাঁর কর্মস্থলের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা সহকারী কমিশনার (ভূমি), যিনি একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, তাঁর কাছে লিখিত অভিযোগ করেননি?
তাঁদের দাবি, কোনো সরকারি কর্মচারী কর্মস্থলে কোনো গুরুতর অনিয়ম, হুমকি বা অপরাধের শিকার হলে তাৎক্ষণিকভাবে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো এবং প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু কথিত ঘটনার সময় কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে পরবর্তীতে ভুক্তভোগী পাওনা টাকা দাবি করে প্রকাশ্যে অভিযোগ ও সংবাদ সম্মেলন করার পর থানায় অভিযোগ দায়ের করায় বিষয়টি নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়েছে। আরও প্রশ্ন উঠেছে, অভিযোগে উল্লেখিত ঘটনা যদি সত্যিই ঘটে থাকে, তাহলে চেইনম্যান সবুর কেন তখন ভুক্তভোগীকে ৫০ হাজার টাকা ফেরত দিয়েছিলেন এবং বাকি টাকা এক মাস পর দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন? ভুক্তভোগীর ভাষ্য, এই প্রশ্নগুলোর উত্তর তদন্তের মাধ্যমে বেরিয়ে আসা জরুরি। সরকারি দপ্তরের কর্মচারীর বিরুদ্ধে ঘুষের অভিযোগ। ভুক্তভোগী হাফিজ মোল্লা বলেন, তাঁর মূল দাবি কোনো ব্যক্তিকে হয়রানি করা নয়; তিনি শুধু তাঁর কাছ থেকে নেওয়া অবশিষ্ট ৭০ হাজার টাকা ফেরত চান এবং ঘুষ নেওয়ার অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত চান। তিনি আরও দাবি করেন, একজন সরকারি দপ্তরের কর্মচারীর বিরুদ্ধে এত গুরুতর অভিযোগ ওঠার পর বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরে এনে তদন্ত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে তাঁর ও সাক্ষীদের বিরুদ্ধে করা থানার অভিযোগও নিরপেক্ষভাবে যাচাই করার দাবি জানান তিনি। দুই পক্ষের বক্তব্যেই বেরিয়ে আসতে পারে প্রকৃত সত্য ঘুষ গ্রহণ, টাকা ফেরত দেওয়া, বাকি টাকা পরিশোধের প্রতিশ্রুতি এবং পরবর্তীতে থানায় পাল্টা অভিযোগ, পুরো ঘটনাটিতে একাধিক প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। এসব অভিযোগের সত্যতা শুধু অভিযোগ বা সংবাদ প্রকাশের মাধ্যমে চূড়ান্তভাবে নির্ধারণ করা যায় না। এবিষয়ে নড়াইল সদর সহকারী কমিশনার ভূমি অফিসের চেইনম্যান সবুর শেখ কামালের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করার চেষ্টা করলে তার মুঠোফোন বন্ধ পাওয়া যায়। ফলে তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি। এবিষয়ে নড়াইল সদর সহকারী কমিশনার (ভূমি) কে এইচ এম তাসফিকুর রহমান বলেন, ভুক্তভোগী আমার দপ্তরে অভিযোগ দিলে তদন্ত করে ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে।
অভিযোগের সত্যতা তদন্তে প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা এবং অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হলে অভিযোগকারীর বিরুদ্ধেও যথাযথ ব্যবস্থা, এমনটাই প্রত্যাশা ভুক্তভোগী ও স্থানীয়দের।