
নিজস্ব প্রতিবেদক
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) পরিবহন বিভাগের কনস্টেবল হুমায়ুন কবীর হত্যাকাণ্ডে উঠে এসেছে রোমহর্ষক পরিকল্পনার তথ্য। স্ত্রীর পরকীয়া সম্পর্ক ও আর্থিক লেনদেনের জটিলতা থেকে জন্ম নেয় এই হত্যার ছক। এমনকি খুনিদের পারিশ্রমিক দেওয়ার জন্য ভিকটিমের পেনশনের টাকা ব্যবহার করার পরিকল্পনাও ছিল বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। ২০২৫ সালের ২৮ এপ্রিল পুরান ঢাকার দয়াগঞ্জ এলাকায় নিজ বাসার সামনে থেকে হুমায়ুন কবীরের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। প্রথমে এটি রহস্যজনক মৃত্যু মনে হলেও, তদন্তে বেরিয়ে আসে এটি একটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা যাত্রাবাড়ী থানার এসআই আওলাদ হুসাইন চলতি বছরের মার্চে ১১ জনকে আসামি করে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেন। ঢাকা মহানগর হাকিম সারাহ ফারজানা হক গত ১ জুলাই অভিযোগপত্রটি আমলে নিয়েছেন। শিগগিরই অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে বিচার প্রক্রিয়া শুরু হবে।
স্ত্রীসহ ১১ জনের সম্পৃক্ততা এই মামলার প্রধান অভিযুক্ত নিহতের স্ত্রী সালমা বেগম। অন্যান্য আসামিরা হলেন, রাজীব হোসেন, মরিয়ম বেগম (মলি), পলি বেগম, কায়েস হাওলাদার, ফজলে রাব্বি শুভ, রাফি খান, আকাশ, আশিক, সজীব ও সাব্বির।
তাদের মধ্যে চারজন পলাতক রয়েছেন এবং তাঁদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে। আগামী ১৩ আগস্ট এ বিষয়ে আদালতে প্রতিবেদন দাখিলের দিন ধার্য রয়েছে। বর্তমানে সালমা, পলি ও রাফি কারাগারে আছেন; অন্যদিকে রাজীব, মলি, কায়েস ও শুভ জামিনে মুক্ত। পরকীয়া ও টাকার দ্বন্দ্বে হত্যার ছক তদন্তে জানা যায়, হুমায়ুন কবীরের সঙ্গে স্ত্রী সালমার দাম্পত্য জীবনে ফাটল ধরে সালমার বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের কারণে। নিকটাত্মীয় রাজীব হোসেনের সঙ্গে তার সম্পর্ক গড়ে ওঠে প্রায় এক বছর আগে। বিষয়টি জানাজানি হলে ২০২৫ সালের ২৫ এপ্রিল পারিবারিক সালিসে সালমা সম্পর্ক ছিন্ন করার প্রতিশ্রুতি দেন। এদিকে, হুমায়ুনের কাছ থেকে সালমার আত্মীয় মরিয়ম বেগমের স্বামী বাবুল মুন্সী প্রায় ১০ লাখ টাকা ধার নিয়েছিলেন, যা ফেরত দেওয়া হয়নি। এই অর্থনৈতিক চাপ ও পরকীয়া সম্পর্ক, দুটি কারণ মিলেই হত্যার পরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হয়। ভাড়াটে খুনি, ঘুমের ওষুধ, তারপর শ্বাসরোধ অভিযোগপত্র অনুযায়ী, প্রায় দুই মাস ধরে চলে হত্যার প্রস্তুতি। ভাড়াটে খুনি নিয়োগ, দা-রশি-গ্লাভস সংগ্রহ, সবই করা হয় পরিকল্পিতভাবে। একাধিকবার চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর কৌশল পাল্টানো হয়। ঘটনার আগের দিন রাতে সালমা ও পলি একটি ফার্মেসি থেকে ঘুমের ওষুধ কিনে আনেন। ২৭ এপ্রিল রাতে খাবারের সঙ্গে সেই ওষুধ মিশিয়ে হুমায়ুনকে অচেতন করা হয়।
রাত গভীর হলে কয়েকজন সহযোগী বাসায় ঢুকে অচেতন হুমায়ুনের হাত-পা বেঁধে ফেলে। এরপর রশি দিয়ে গলায় ফাঁস লাগিয়ে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, এ সময় সালমা নিজেই স্বামীর পা চেপে ধরে রাখেন। মরদেহ ফেলে নাটক সাজানোর চেষ্টা হত্যার পর মরদেহ ভবনের নিচে নামিয়ে বাইরে ফেলে দেওয়ার চেষ্টা করা হলেও, আশপাশে লোকজন থাকায় তা সম্ভব হয়নি। পরে বাসার গেটের কাছে মরদেহ ফেলে রেখে আসামিরা বাইরে থেকে তালা লাগিয়ে পালিয়ে যায়, যাতে ঘটনাটি অন্যভাবে দেখানো যায়। পেনশনের টাকা দিয়ে খুনের মূল্য!
তদন্তে উঠে এসেছে, খুনের পরপরই দুই আসামিকে ৫ হাজার টাকা করে দেওয়া হয়। বাকি অর্থ হুমায়ুনের মৃত্যুর পর পাওয়া পেনশনের টাকা থেকে পরিশোধ করার পরিকল্পনা ছিল। তদন্তে স্বীকারোক্তি
পুলিশের সন্দেহ হলে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদে অভিযুক্তরা হত্যার সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেন। তদন্ত কর্মকর্তা আওলাদ হুসাইন বলেন, পরকীয়া সম্পর্ক ও আর্থিক লেনদেন, এই দুই কারণেই পরিকল্পিতভাবে হুমায়ুনকে হত্যা করা হয়েছে। এটি একটি চাঞ্চল্যকর ঘটনা।
আইনি প্রক্রিয়া চলছে মামলার বাদী খোকন হাওলাদারের সঙ্গে যোগাযোগ করা না গেলেও, আসামি সালমার আইনজীবী জানিয়েছেন, আদালত সাক্ষ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেবেন। এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডে পরিবারের ভেতরের বিশ্বাসঘাতকতা, লোভ ও সম্পর্কের জটিলতা এক ভয়াবহ পরিণতির দিকে নিয়ে গেছে, যা সমাজে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।