
উপজেলা প্রতিনিধি, চৌগাছা (যশোর):
যশোরের চৌগাছায় কৃষি মন্ত্রণালয়ের সরকারি সারের ডিলারশিপের চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ কেন্দ্র করে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। তালিকায় আওয়ামী লীগের দলীয় কর্মী এবং ভ্রাম্যমাণ আদালতে জরিমানা পাওয়া ব্যক্তির প্রতিষ্ঠানের নাম স্থান পাওয়ায় স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গত গতকাল দেশব্যাপী সরকারি সারের চূড়ান্ত ডিলার তালিকা প্রকাশ পায়। এ তালিকায় চৌগাছা সদর ইউনিয়ন ব্যতীত উপজেলার ১০টি ইউনিয়ন ও ১টি পৌরসভার অনুকূলে মোট ১১টি ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের নাম চূড়ান্ত করা হয়। তবে এর মধ্যে ৩টি ইউনিয়নের ডিলারশিপ প্রাপ্তদের নাম নিয়ে চৌগাছাজুড়ে শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক।
অভিযোগ উঠেছে, উপজেলার সুখপুকুরিয়া ইউনিয়নে সারের ডিলারশিপ পেয়েছেন ‘বিশ্বাস ট্রেডার্স’-এর মালিক শ্যামল কুমার বিশ্বাস, যিনি আওয়ামী লীগের একজন সক্রিয় কর্মী হিসেবে পরিচিত। স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মী ও সাধারণ সচেতন সমাজ এই নামটির অনুমোদন নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রবল ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। অভিযোগ উঠেছে, বিপুল অঙ্কের আর্থিক লেনদেনের বিনিময়ে তিনি এই ডিলারশিপ বাগিয়ে নিয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সুমি খাতুন নামে এক ব্যক্তি দাবি করেন, স্থানীয় মেম্বার গোবিন্দ কুমারের মাধ্যমে ২০ লাখ টাকার বিনিময়ে এবং মন্ত্রিপরিষদ সচিবের তদবিরে শ্যামল কুমার বিশ্বাসকে এই ডিলারশিপ দেওয়া হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে বর্তমানে উপজেলার সাধারণ মানুষের মুখে মুখে নানা আলোচনা-সমালোচনা চলছে।
অন্যদিতে, পাশাপোল ইউনিয়নে সারের ডিলারশিপ পেয়েছেন ‘মেসার্স রিমন ট্রেডার্স’-এর মালিক মো. ইমদাদুল হক। অভিযোগ রয়েছে, তিনিও আওয়ামী লীগের সক্রিয় রাজনীতির সাথে যুক্ত এবং এই ব্যবসার মূল পরিচালক তার ভাই মেহেদী হাসান পাশাপোল ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের পদধারী নেতা।
সবচেয়ে বেশি বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে ধুলিয়ানী ইউনিয়নের ডিলারশিপ নিয়ে। সেখানে চূড়ান্ত তালিকায় নাম এসেছে ‘মেসার্স লিমন এন্টারপ্রাইজ’-এর মালিক মোছা. রনজু বেগমের। অনুসন্ধানে জানা যায়, তার স্বামী খায়রুল ইসলাম গত ২৬ আগস্ট ২০২৬ তারিখে সরকারি সার চোরাইপথে বিক্রির উদ্দেশ্যে গুদামে মজুদ রাখেন। খবর পেয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে ২৭১ বস্তা সার জব্দসহ তাকে ২০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। সার কারচুপির দায়ে সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তির স্ত্রীর নামে ডিলারশিপ দেওয়ায় স্থানীয়রা চরম বিস্ময় প্রকাশ করেছেন।
অভিযোগ রয়েছে, এই ইউনিয়নে উপজেলা ছাত্রদলের সদস্য সচিব ইমন হাসানের রকির হাসান এন্টারপ্রাইজ’ প্রাথমিক পর্যায়ে উপজেলা থেকে পাঠানো তালিকার ১ নম্বরে অবস্থান করছিল। তবে পরবর্তীতে সার কারচুপির অভিযোগে অভিযুক্ত খায়রুল ইসলামের স্ত্রীর প্রতিষ্ঠানের নাম চূড়ান্ত তালিকায় স্থান পায়।
এসব বিষয়ে মন্তব্যের জন্য মন্ত্রিপরিষদ সচিবের ব্যক্তিগত সহকারী (পিএস) এবং চৌগাছা উপজেলা নির্বাহী অফিসারকে (ইউএনও) একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তারা কল রিসিভ করেননি।
সমসাময়িক এই পরিস্থিতি ও অনিয়মের বিষয়ে চৌগাছা উপজেলা বিএনপির সভাপতি এম এ সালাম বলেন, “যে তিনটি ডিলারশিপ নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, সে বিষয়ে আমি অবগত। জেলায় সুপারিশ পাঠানোর আগেই আমি অনিয়মের এই আভাস পেয়েছিলাম। এজন্য উপজেলা নির্বাহী অফিসার একটি সভা ডাকলেও আমি সেখানে যাইনি এবং দলের অনেককেও যেতে নিষেধ করেছিলাম। কিন্তু তা সত্ত্বেও অনেকে উপস্থিত হন, যার ফলস্বরূপ আজ চিহ্নিত আওয়ামী লীগ কর্মী ও চুরি করে সার বিক্রি করা ব্যক্তির পরিবারের সদস্যরা ডিলারশিপ পেলেন। পক্ষান্তরে, সংশ্লিষ্ট ইউনিয়নগুলোতে বিএনপির ত্যাগী নেতাকর্মীরা বঞ্চিত হলেন।”
ডিলারশিপ বণ্টনের এই বিতর্কিত সিদ্ধান্ত অবিলম্বে বাতিল করে স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় পুনরায় তালিকা নির্ধারণের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।