
নিজস্ব প্রতিবেদক
আমরা এ দেশের নাগরিক। সংবিধান আমাদের নিরাপত্তা, অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষার প্রধান দায়িত্ব রাষ্ট্রের, বিশেষ করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর। কিন্তু সাম্প্রতিক বাস্তবতা আমাদের সামনে এক গভীর উদ্বেগের চিত্র তুলে ধরছে।
দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সংঘর্ষ, সহিংসতা ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ক্রমেই বেড়ে চলেছে। সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, অনেক ক্ষেত্রেই এসব ঘটনার সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা থাকে নীরব, নিষ্ক্রিয় কিংবা দেরিতে প্রতিক্রিয়াশীল। জনসমক্ষে মানুষ নির্যাতিত হচ্ছে, লাঞ্ছিত হচ্ছে, তথাকথিত ‘মব জাস্টিস-এর শিকার হচ্ছে, কিন্তু এসব ঘটনায় দৃশ্যমান ও কঠোর আইনি পদক্ষেপ খুব কমই চোখে পড়ে। একটি সভ্য রাষ্ট্রে ‘মব কালচার’ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। আইনের শাসন যেখানে দুর্বল হয়, সেখানেই জনতা আইন নিজের হাতে তুলে নিতে শুরু করে। এটি শুধু একটি বিচ্ছিন্ন সমস্যা নয়, বরং রাষ্ট্রের আইনি কাঠামোর প্রতি মানুষের আস্থাহীনতার বহিঃপ্রকাশ। যখন অপরাধী শাস্তি পায় না, তখনই সমাজে বিশৃঙ্খলা বাড়ে এবং নিরীহ মানুষ ভুক্তভোগী হয়। অন্যদিকে, সমাজের প্রতিটি স্তরে মাদকের ভয়াবহ বিস্তার এখন এক মহামারীর রূপ নিয়েছে। গ্রাম থেকে শহর, ঘরে ঘরে মাদকের ছোবলে যুবসমাজ ধ্বংসের পথে। পরিবার ভেঙে যাচ্ছে, অপরাধ বাড়ছে, সামাজিক স্থিতিশীলতা নষ্ট হচ্ছে। অথচ মাদকবিরোধী কার্যক্রম অনেক ক্ষেত্রেই সীমিত, বিচ্ছিন্ন এবং অপ্রতুল বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। মাঝে মাঝে অভিযান হলেও তা দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারছে না। প্রশ্ন উঠছে, আইন কি শুধু কাগজে-কলমে? সংসদে আইন পাশ হয়, নীতিমালা তৈরি হয়, কিন্তু বাস্তব প্রয়োগে তার কার্যকারিতা কোথায়? যদি আইন প্রয়োগ না হয়, তবে সেই আইন জনগণের কাছে অর্থহীন হয়ে পড়ে।
তবে সমালোচনার পাশাপাশি বাস্তবতাও বিবেচনায় নিতে হবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নানা সীমাবদ্ধতা, রাজনৈতিক চাপ, জনবল সংকট ও প্রযুক্তিগত ঘাটতির মধ্যেও কাজ করে। অনেক ক্ষেত্রে তারা সফলতাও অর্জন করেছে। কিন্তু বিচ্ছিন্ন সফলতা দিয়ে সামগ্রিক পরিস্থিতির উন্নয়ন সম্ভব নয়। প্রয়োজন একটি সমন্বিত, কঠোর ও নিরপেক্ষ কর্মপন্থা। এখন সময় এসেছে বাস্তবমুখী পদক্ষেপ গ্রহণের, প্রথমত, আইন প্রয়োগে শূন্য সহনশীলতা (Zero Tolerance) নীতি নিশ্চিত করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, মব জাস্টিসের বিরুদ্ধে দ্রুত বিচার ও দৃশ্যমান শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।
তৃতীয়ত, মাদকবিরোধী অভিযানকে ধারাবাহিক, গোয়েন্দাভিত্তিক ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করতে হবে। চতুর্থত, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জবাবদিহিতা ও পেশাদারিত্ব বাড়াতে হবে। পঞ্চমত, সাধারণ মানুষের মধ্যে আইনের প্রতি আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে।
রাষ্ট্রের শক্তি তার জনগণ। আর জনগণের আস্থা ছাড়া কোনো রাষ্ট্র শক্তিশালী হতে পারে না। তাই আজকের এই সংকটময় সময়ে প্রয়োজন দৃঢ় নেতৃত্ব, কার্যকর আইন প্রয়োগ এবং ন্যায়বিচারের সুস্পষ্ট প্রতিফলন। নাগরিক হিসেবে আমাদের দাবি একটাই, নিরাপদ বাংলাদেশ। সেই নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব, আর সেই দায়িত্ব পালনে কোনো ধরনের নীরবতা বা ব্যর্থতা ইতিহাস কখনো ক্ষমা করবে না।