
নিজস্ব প্রতিবেদক
মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের পর এক সপ্তাহের মধ্যে নতুন জাতীয় পে-স্কেলের প্রজ্ঞাপন (গেজেট) জারি হওয়ার প্রত্যাশা থাকলেও প্রায় দুই সপ্তাহ পেরিয়ে গেছে। এখনো প্রজ্ঞাপন জারি হয়নি। এমনকি নতুন বেতনকাঠামোর খসড়াটি এখনো আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিংয়ের জন্য পাঠানো হয়নি। এটি বর্তমানে অর্থ মন্ত্রণালয়ে রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্র বলছে, নতুন বেতনকাঠামোর খসড়া চূড়ান্ত করার কাজ চলছে। শিগগিরই তা আইন মন্ত্রণালয়ে ভেটিংয়ের জন্য পাঠানো হতে পারে। ভেটিং সম্পন্ন হওয়ার পরই আনুষ্ঠানিক প্রজ্ঞাপন জারির প্রক্রিয়া এগোবে।
সম্প্রতি মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত প্রস্তাব অনুযায়ী, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মূল বেতন ১০০ থেকে ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। মূল বেতন ও নিট পেনশন চলতি বছরের ১ জুলাই থেকে ২০২৭ সালের ১ জুলাইয়ের মধ্যে তিন ধাপে বাস্তবায়নের কথা রয়েছে। অন্যদিকে বিভিন্ন ভাতা কার্যকর করার প্রস্তাব রয়েছে ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে।
নতুন কাঠামোয় বেতন-ভাতার পাশাপাশি সরকারি চাকরিজীবীদের বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধায়ও পরিবর্তনের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ১১টি পরিবর্তন হলো,
১. বাড়ছে বাড়িভাড়া ভাতা
ঢাকা সিটি করপোরেশন এলাকায় বাড়িভাড়া ভাতা মূল বেতনের সর্বোচ্চ ৬০ শতাংশ করার প্রস্তাব রয়েছে। অন্যান্য সিটি করপোরেশন ও সাভার এলাকায় সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ এবং অন্যান্য এলাকায় গ্রেডভেদে সর্বোচ্চ ৪৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িভাড়া ভাতা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
২. বয়স বাড়লে বাড়বে চিকিৎসাভাতা
বয়সের সঙ্গে চিকিৎসাভাতার পরিমাণ বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। ৫০ বছর পর্যন্ত মাসে ৩ হাজার টাকা, ৫০ বছরের বেশি থেকে ৬০ বছর পর্যন্ত ৪ হাজার, ৬০ বছরের বেশি থেকে ৭০ বছর পর্যন্ত ৫ হাজার এবং ৭০ বছরের বেশি বয়সে ৬ হাজার টাকা চিকিৎসাভাতা দেওয়ার কথা রয়েছে।
৩. নিম্ন গ্রেডে তুলনামূলক বেশি বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি
নতুন কাঠামোয় নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের বার্ষিক বেতন বৃদ্ধির হার তুলনামূলক বেশি রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। গ্রেড-৬ ও তার নিচের গ্রেডে ৫ শতাংশ, গ্রেড-৪ ও ৩-এ ৩ দশমিক ৫ শতাংশ এবং গ্রেড-২-এ ২ দশমিক ৭৫ শতাংশ হারে বার্ষিক বেতন বৃদ্ধির প্রস্তাব রয়েছে।
৪. সব গ্রেডে মোবাইল ভাতা
নতুন কাঠামোয় সব গ্রেডের সরকারি কর্মচারীর জন্য মোবাইল ভাতার প্রস্তাব করা হয়েছে। গ্রেড-৫ ও তার ঊর্ধ্বে ৫০০ টাকা এবং গ্রেড-৬ ও নিচের গ্রেডে ১৫০ টাকা মোবাইল ভাতা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
৫. দ্বিগুণ হচ্ছে যাতায়াত ভাতা
বর্তমানে ৩০০ টাকা যাতায়াত ভাতা দেওয়া হলেও নতুন কাঠামোয় তা বাড়িয়ে ৬০০ টাকা করার প্রস্তাব রয়েছে। একই সঙ্গে টিফিন ভাতা ২০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫০০ টাকা এবং ধোলাই ভাতা ১০০ টাকা থেকে ৩০০ টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
৬. প্রতিবন্ধী সন্তানের জন্য নতুন ভাতা
বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন বা প্রতিবন্ধী সন্তানের জন্য নতুন করে মাসিক ৩ হাজার টাকা ভাতা চালুর প্রস্তাব রয়েছে। সর্বোচ্চ দুই সন্তান এ সুবিধার আওতায় আসবেন।
৭. কমছে বাংলা নববর্ষ ভাতা
নতুন বেতন কাঠামোয় বাংলা নববর্ষ ভাতা কিছুটা কমানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। বর্তমানে মূল বেতনের ২০ শতাংশ হারে এ ভাতা দেওয়া হলেও নতুন কাঠামোয় তা কমিয়ে ১৫ শতাংশ করার কথা বলা হয়েছে।
৮. ঝুঁকি ও বিশেষ ভাতায় পরিবর্তন
প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানে প্রেষণ ভাতা মূল বেতনের ১০ শতাংশ হারে নির্ধারণের প্রস্তাব রয়েছে। পাশাপাশি ঝুঁকি ভাতা ও বিশেষ ভাতা ক্ষেত্রবিশেষে ২০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে। তবে শিক্ষা সহায়ক ভাতা, কার্যভার ভাতা, আপ্যায়ন ভাতা ও উৎসব ভাতা আগের হারেই বহাল রাখার প্রস্তাব রয়েছে।
৯. পাহাড়ি ও দুর্গম এলাকায় ভাতা
পাহাড়ি এলাকার সরকারি চাকরিজীবীদের মূল বেতনের ২০ শতাংশ হারে ভাতা দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে। পার্বত্য জেলা সদর ও সদর উপজেলায় এ ভাতার সর্বোচ্চ সীমা ৫ হাজার টাকা এবং অন্যান্য পাহাড়ি এলাকায় সর্বোচ্চ ৫ হাজার ২০০ টাকা নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে।
এ ছাড়া হাওর, দ্বীপ ও চর এলাকায় মূল বেতনের ২০ শতাংশ হারে ভাতা আগের মতো রাখার প্রস্তাব রয়েছে। তবে এর সর্বোচ্চ সীমা ৫ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হতে পারে।
১০. পেনশন ও গ্র্যাচুইটিতে পরিবর্তন
‘এক গ্রেড এক পেনশন’ পদ্ধতি বাস্তবায়নের প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে নিট পেনশনের নতুন সীমা নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে সর্বনিম্ন নিট পেনশন ১০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ ৭০ হাজার ২০০ টাকা করার কথা রয়েছে।
১১. সামরিক বাহিনীর বিভিন্ন ভাতায় পরিবর্তন
সশস্ত্র বাহিনীর অফিসার ও সদস্যদের বিভিন্ন ভাতাতেও পরিবর্তনের প্রস্তাব রয়েছে। প্রতিরক্ষা ভাতা, কিট ভাতা, ডেঞ্জার মানি, দোভাষী ভাতা ও শিক্ষকতা ভাতাসহ বেশির ভাগ ভাতার বিদ্যমান পরিমাণের ওপর ১০ শতাংশ বৃদ্ধির সুপারিশ করা হয়েছে।
প্রজ্ঞাপনের অপেক্ষায় লাখো সরকারি চাকরিজীবী
মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের পর নতুন পে-স্কেল নিয়ে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে প্রত্যাশা তৈরি হলেও প্রজ্ঞাপন জারি না হওয়ায় অপেক্ষা আরও দীর্ঘ হচ্ছে। অর্থ বিভাগ সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, খসড়া যাচাই-বাছাই ও প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া শেষে আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং নেওয়া হবে। এরপরই আনুষ্ঠানিক প্রজ্ঞাপন জারির বিষয়টি সামনে আসবে।
তবে প্রজ্ঞাপন জারি না হওয়া পর্যন্ত প্রস্তাবিত বেতন-ভাতা ও সুবিধাগুলোকে চূড়ান্ত বাস্তবায়িত সিদ্ধান্ত হিসেবে গণ্য করা যাবে না। ভেটিং ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় কোনো সংশোধন বা পরিবর্তন এলে চূড়ান্ত গেজেটে তার প্রতিফলন ঘটতে পারে।