
নিজস্ব প্রতিবেদক
পরিবার ও এলাকাবাসীর কাছে তিনি ছিলেন মৃত। তার জন্য হয়েছে দোয়া, মিলাদ, এমনকি কাঙালি ভোজও। অথচ সেই আলমগীর হাওলাদারই ১৮ বছর পর হঠাৎ ফিরে এলেন নিজের ভিটেমাটিতে, এক হৃদয়বিদারক বাস্তবতা নিয়ে। বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলার চরদুয়ানী ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের ছোট টেংরা গ্রামের বাসিন্দা আলমগীর হাওলাদার (পিতা: মৃত সিকান্দার আলী হাওলাদার) দীর্ঘ ১৮ বছর নিখোঁজ থাকার পর গত ২৯ জুলাই বাড়িতে ফিরে আসেন। তার ফিরে আসাকে ঘিরে এলাকায় সৃষ্টি হয়েছে আবেগঘন পরিবেশ। স্থানীয় ও পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, ২০০৮ সালে অভাবের তাড়নায় স্ত্রী আমেনা বেগম ও ছোট মেয়ে খাদিজাকে নিয়ে ঢাকায় পাড়ি জমান আলমগীর। সেখানে তিনি দিনমজুর হিসেবে কাজ করতেন এবং তার স্ত্রী একটি গার্মেন্টসে চাকরি করতেন। কিন্তু সেই বছরের নভেম্বর মাসেই হঠাৎ নিখোঁজ হয়ে যান তিনি।
আলমগীরের দাবি, ঢাকার পোস্তগোলা এলাকায় কাজের সন্ধানে বের হলে একটি অপহরণকারী চক্র তাকে মাইক্রোবাসে তুলে নিয়ে যায়। এরপর চোখ বেঁধে অজ্ঞাত একটি উঁচু দেয়ালঘেরা স্থানে আটকে রাখা হয়। সেখানে তার মতো আরও প্রায় ৩০ জনকে জোরপূর্বক শ্রমে নিয়োজিত করা হতো। খাবার ও মানবিক সুযোগ-সুবিধার চরম অভাবে অমানবিক জীবন কাটাতে হয়েছে তাকে। তিনি জানান,আমাদের দিয়ে প্রতিদিন কাজ করানো হতো, কিন্তু কোনো বেতন দেওয়া হতো না। ঠিকমতো খাবারও পেতাম না, মাঝে মাঝে পাতলা ডাল আর আলু ভর্তাই ছিল ভরসা। এদিকে দীর্ঘদিন খোঁজাখুঁজির পর আলমগীরকে না পেয়ে তার স্ত্রী আমেনা বেগম অন্যত্র বিয়ে করে নতুন সংসার গড়েন। মেয়ে খাদিজা বাবার অনুপস্থিতিতে মানুষের বাড়িতে কাজ করে বড় হন এবং পরবর্তীতে তারও বিয়ে হয়ে যায়। তবে মেয়ের বর্তমান অবস্থান সম্পর্কে কিছুই জানেন না আলমগীর। ছেলের অপেক্ষায় থাকতে থাকতে পাঁচ বছর আগে মারা যান তার বাবা-মা। ফিরে এসে তাদের আর দেখতে পাননি তিনি। বর্তমানে তার এক ভাই রয়েছেন, যিনি নিজ পরিবার নিয়ে ব্যস্ত।
আলমগীর জানান, গত ২৮ জুলাই গভীর রাতে তাকে ও আরও প্রায় ৩০ জনকে চোখ বাঁধা অবস্থায় ঢাকার পোস্তগোলা ব্রিজের পাশে ফেলে রেখে যায় দুর্বৃত্তরা। পরে তিনি এক ব্যক্তির সহায়তায় বালুবাহী জাহাজে একদিন কাজ করে ৫০০ টাকা উপার্জন করেন এবং সেই টাকা দিয়েই বাড়ি ফেরেন। তার ভাষ্য, সরকার পরিবর্তনের পর হয়তো অপহরণকারীরা ভয় পেয়ে আমাদের ছেড়ে দিয়েছে। এদিকে আলমগীরকে ফিরে পেয়ে স্বজন ও এলাকাবাসীর মধ্যে দেখা যায় আবেগঘন দৃশ্য। অনেকেই চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি। বিএনপির সাবেক উপজেলা যুগ্ম আহ্বায়ক মোহাম্মদ বদিউজ্জামান সাহেদ বলেন, প্রায় ১৮ বছর ধরে তিনি নিখোঁজ ছিলেন। তাকে মৃত ভেবে দোয়া-মাহফিলও করা হয়েছে। ফিরে আসার পর আমরা তাকে পাথরঘাটা হাসপাতালে ভর্তি করি। চিকিৎসা শেষে আজ তাকে বাড়িতে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। দীর্ঘ বন্দিদশা ও মানসিক আঘাতে আলমগীর এখনো স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেননি। বেশিরভাগ সময় তিনি নীরব থাকেন। তার চোখেমুখে যেন লেগে আছে হারিয়ে যাওয়া ১৮ বছরের গভীর ছাপ। এই ঘটনাকে ঘিরে এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। অপহরণ ও জোরপূর্বক শ্রমের অভিযোগের বিষয়ে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।