
নিজস্ব প্রতিবেদক
ঘুষ না দিলে ঘোরে ফাইল, কথা না শুনলে জোটে মামলা
যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলা ভূমি অফিস এখন অনিয়ম ও ঘুষ বাণিজ্যের এক অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। আর এই পুরো ঘুষ সাম্রাজ্যের নেপথ্যে থেকে কলকাঠি নাড়ছেন ভূমি অফিসের বিতর্কিত সার্ভেয়ার জনাব ফিরোজ। সরেজমিনে অনুসন্ধান ও স্থানীয় সেবাগ্রহীতাদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, সার্ভেয়ার ফিরোজ ঘুষের বিনিময় ছাড়া কোনো ফাইল ছাড়েন না। যিনি বা যারা ঘুষের টাকা দিতে পারেন না, তাদের ফাইল মাসের পর মাস আটকে রাখেন তিনি। শুধু তা-ই নয়, যে বা যারা ভূমি অফিসে সেবা নিতে আসেন, তারা তার মনমতো না চললে বা অন্যায়ের প্রতিবাদ করলে তাদের সাথে প্রচন্ড বাজে ও উদ্ধত আচরণ করেন। ফিরোজের এমন বেপরোয়া অনিয়ম ও স্বেচ্ছাচারিতায় পুরো ঝিকরগাছাবাসী এখন চরম অতিষ্ঠ।
সার্ভেয়ার ফিরোজের অনিয়ম কেবল ঘুষ বাণিজ্য ও খারাপ ব্যবহারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। তার কথামতো না চললে বা তার কথার বাইরে গেলে ভুক্তভোগীদের নামে সরকারবাদী মামলাও তিনি করে থাকেন, এমন নজিরও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। আর এই রকম ভয়াবহ ঘটনার শিকার হয়েছেন উপজেলার হাজিরবাগ ইউনিয়নের রায়পটল গ্রামের দিনহীন সাধারণ কৃষক জনাব নজরুল।
ঘটনার বিবরণ থেকে জানা যায়, ফিরোজের কথামতো ফিরোজকে ২,৪০,০০০/- (দুই লাখ চল্লিশ হাজার) টাকা মাত্র ঘুষ দিতে অস্বীকার করায়, কৃষক নজরুলের নিজ হাতে লাগানো গাছকে জমির মারপ্যাঁচ দেখিয়ে সরকারীবাদী মামলা ঠুকে দেন ফিরোজ। সেখানে দেখানো হয়, নজরুলের গাছগুলো নাকি সরকারি খাস জমিতে লাগানো হয়েছে। যদিও সেই জমি নিয়ে আগে থেকেই অনেক সমস্যা বা জটিলতা আছে, কিন্তু সেটাকে হাতিয়ার বানিয়ে দিনহীন সাধারণ কৃষক নজরুলের বিশাল সর্বনাশ করেন এই কর্মকর্তা ফিরোজ। আর এই বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন হাজিরবাগ ইউনিয়নের বিএনপি নেতা হযরত আলী।
ভুক্তভোগী নজরুল জানান, সার্ভেয়ার ফিরোজ তার ঐ গাছের বাগান দেখার পর তাকে সরাসরি বলেন, আমাকে টাকা না দিলে এটা নিয়ে সমস্যা হবে। পরবর্তীতে জমির মাপজোখে কায়দা করে সমস্যা দেখিয়ে নজরুলের নিজ হাতে লাগানো বাগানের একটা অংশ সরকারি জমিতে লাগানো হয়েছে এই মর্মে নজরুলের নামে মামলা করেন। বিষয়টি জানার পর নজরুল তাকে ফোন দিলে সার্ভেয়ার ফিরোজ তাকে সাফ জানিয়ে দেন, আপনি একা এসে আমার সাথে দেখা করবেন, কোনো নেতাগোতা নিয়ে আসলে হবে না। ফিরোজের কথা অনুযায়ী নজরুল ভূমি অফিসে গেলে ফিরোজ তাকে জানান, মামলা তুলে নেব, কিন্তু সরকারি জমির গাছের যে মূল্য অর্থাৎ ২,৪০,০০০/- টাকার পুরোটাই তাকে দিতে হবে। নজরুল তাকে ২০,০০০/- টাকা দিতে রাজি হলেও ফিরোজের মন গলেনি সেই পরিমাণ টাকায়। ফলাফল, খাস জমির ওপর লাগানো দাবি করা গাছ বিক্রি করে ২,৪০,০০০/- টাকা সরকারি ফান্ডে জমা হয়, আর সাধারণ কৃষক নজরুলকে সেটা চেয়ে চেয়ে দেখা ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না।
অন্যদিকে, মাগুরা ইউনিয়নের এক ভুক্তভোগী জানান, ফিরোজের কাছে তার একটা জমির খারিজ আজ প্রায় এক বছর ধরে পড়ে আছে। ওকে তিনি কোনো কিছু দিতে রাজি হননি বিধায় তার কাজটা করে দেওয়া হয়নি। তিনি অত্যন্ত পরিতাপের সাথে বলেন, কি বলবো বাবা, এই ফিরোজ আমাদের ভূমি অফিসটাকে ঘুষ বাণিজ্যের অভয়ারণ্য বানিয়ে ফেলেছে। ভূমি অফিসের অধিকাংশ ব্যক্তিই সেবাগ্রহীতাদের সাথে খারাপ আচরণ করেন, আর তাদের লিডার হচ্ছেন এই ফিরোজ।
একইভাবে মনিরামপুর উপজেলার খেদাপড়া ইউনিয়নের এক ভুক্তভোগী জানান, তার একটা জমির খারিজ করে দেওয়ার জন্য ইতোমধ্যে সে ২০,০০০/- টাকা নিয়েছে, কিন্তু তার কাজটা এখনো করে দেয় নাই, আজ ৬ মাস হতে চলল। তিনি খুব ভয়ের সুরে তার নামটা প্রকাশ করতে মানা করেন; তার ভয়, যদি পরে তার কাজ আর না করে দেয়!
ঠিক একইভাবে মাগুরা ইউনিয়নের এক নারীকেও ফিরোজ ৮ মাস যাবত তার খারিজের কাজ নিয়ে ঘুরাচ্ছে। ফিরোজের ব্যাপারে খোঁজ নিতে গিয়ে আমাদের সাথে বেশ কয়েক জন ভুক্তভোগীর সাথে কথা হয়। তাদের অধিকাংশের ভাষ্য একই, সার্ভেয়ার ফিরোজ টাকা ছাড়া কোনো ফাইল ছাড়েন না। যার টাকা নাই, ফিরোজ তাদের সাথে ঠিকমতো কথাও বলেন না, সেবা দেওয়া তো অনেক দূরের কথা।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ফিরোজ এখান থেকে এর আগে বদলি হয়েছিলেন, কিন্তু পরবর্তীতে আবারো এখানে চলে আসেন। যদিও ফিরোজের নিজ গ্রামের বাড়ি বরিশাল বিভাগে, কিন্তু ঝিকরগাছার ঘুষ নামক মধুর হাঁড়ি তাকে বারবার এখানে টেনে আনে।
উপজেলার সদর ইউনিয়নের এক মুরব্বি ক্ষোভের সাথে বলেন, ফিরোজ আমাদের ভূমি অফিসটাকে তার সুদ-ঘুষের রামরাজত্ব বানিয়েছে। সরকারি কর্মকর্তা হয়ে সে সবসময় আকাশে উড়ে, কারো সাথে ঠিকমতো কথা বলে না। আমার একটা কাজ নিয়ে ৬ মাস ধরে হাঁটছি ভূমি অফিসে, হাঁটতে হাঁটতে আমার জুতা ছিঁড়ে গেছে কিন্তু বাবা কাজ আজ পর্যন্ত হয়নি। আমি যদি ফিরোজকে টাকা দিতে পারতাম, তাহলে অনেক আগেই আমার কাজ হয়ে যেত। ফিরোজের বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ হচ্ছে, তিনি ঠিকমতো অফিস করেন না, আর করলেও সকাল ১১টার আগে তাকে অফিসে পাওয়া যায় না। ফিরোজের রুমের সামনে লম্বা লাইন পড়ে থাকে প্রতিদিন, কিন্তু ফিরোজের পাত্তা পাওয়া যায় না। এই সংক্রান্ত একটা ভিডিও আমাদের হাতে এসে পৌঁছেছে। ফিরোজের এই ঘুষ বাণিজ্য আর সেবাগ্রহীতাদের সাথে খারাপ ব্যবহারের বিষয়টি পুরো ঝিকরগাছা উপজেলা জানে, কিন্তু তার পরও তার কেউ কিছু করতে পারে না। অন্যদিকে, ফিরোজের অনিয়মের বিষয়ে ভূমি অফিসের নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক ব্যক্তি বলেন, উনার মতো ঘুষখোর অফিসার আমি আমার জীবনেও দেখিনি। উনি কারো সাথে ভালো ব্যবহার করেন না। টাকা না দিলে উনি কাউকে চিনেন না। উল্লেখিত ঘুষ বাণিজ্য এবং অনিয়মের বিষয়ে ফিরোজের সাথে কথা বলা হলে তিনি খুব অহংকারের সুরে বলেন, এগুলো সব মিথ্যা ও বানোয়াট। অন্যদিকে, ঝিকরগাছা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বলেন, আমি এখানে নতুন যোগদান করেছি। বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ঝিকরগাছা ভূমি অফিসে সার্ভেয়ার ফিরোজের এমন ওপেন-সিক্রেট দুর্নীতি, অনিয়ম ও সাধারণ মানুষকে হয়রানির চিত্র ইতোমধ্যেই ক্ষোভের দাবানল জ্বালিয়েছে পুরো উপজেলায়। সরকারি ক্ষমতার অপব্যবহার করে একজন সাধারণ কৃষককে নিঃস্ব করা থেকে শুরু করে ঘুষের বিনিময় ছাড়া কাজ না করার এই চর্চা কেবল প্রশাসনের ভাবমূর্তিই ক্ষুণ্ন করছে না, বরং সাধারণ মানুষের শেষ ভরসাস্থল ভূমিসেবা ব্যবসায়ে রূপ নিয়েছে। নবনিযুক্ত উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার খতিয়ে দেখার আশ্বাসের পর এখন ঝিকরগাছাবাসী অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন, কখন এই স্বৈরাচারী কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক বিভাগীয় তদন্ত ও কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে, যাতে সাধারণ মানুষ ভয় ও ঘুষমুক্ত পরিবেশে তাদের প্রাপ্য আইনি সেবা ফিরে পান।