
নিজস্ব প্রতিবেদক
যশোরের অভয়নগর প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করেছেন রবিউল নামের এক ব্যক্তি। রবিবার ৩০ আগষ্ট সকালে অভয়নগর প্রেসক্লাবে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনর মাধ্যমে অভিযোগ করেছেন। সংবাদ সম্মেলনে রবিউল ইসলাম বলেন, সৌদি আরবে ভালো বেতনে চাকরি দেওয়ার কথা বলে প্রতারণা, নির্যাতন ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ তুলেছেন। তাঁর অভিযোগ, সৌদি আরবে পাঠানোর কথা বলে দুই ভাই সোহাগ সওদাগর ও মামুন সওদাগর তাঁর কাছ থেকে কয়েক দফায় টাকা নেন। ২০২৪ সালের মে মাসে সৌদি আরবে যাওয়ার পর তাঁকে একটি অন্ধকার ঘরে আটকে রেখে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা হয় এবং আরও টাকা দাবি করা হয়।
রবিউলের দাবি, পরিবারের পক্ষে অতিরিক্ত টাকা দেওয়া সম্ভব না হওয়ায় তাঁকে ঢাকার ‘রানা’ নামের এক ব্যক্তির কাছে হস্তান্তর করা হয়। সেখানেও তাঁকে আটকে রেখে নির্যাতন করা হয় বলে অভিযোগ তাঁর। পরে সুযোগ পেয়ে আরও কয়েকজনের সঙ্গে তিনি কথিত বন্দিশালা থেকে পালিয়ে যান।
রবিউল ইসলাম যশোরের অভয়নগর উপজেলার প্রেমবাগ স্কুল এলাকার বাসিন্দা। সম্প্রতি সাংবাদিকদের কাছে দেওয়া লিখিত অভিযোগে তিনি এসব কথা জানিয়েছেন। রবিউলের ভাষ্য অনুযায়ী, সোহাগ সওদাগর ও তাঁর ভাই মামুন সওদাগর, যশোরের কোতোয়ালি থানার গাইদঘাছি এলাকার বাসিন্দা, তাঁকে সৌদি আরবে ভালো বেতনে চাকরি দেওয়ার কথা বলেন। তাঁদের কথায় বিশ্বাস করে তিনি বিদেশ যাওয়ার প্রস্তুতি নেন। রবিউলের অভিযোগ, ভিসা ও সৌদি আরবে যাওয়ার খরচ বাবদ প্রথমে ৩ লাখ টাকা এবং পরে আরও ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা নেওয়া হয় তাঁর কাছ থেকে।
তিনি বলেন, ২০২৪ সালের ১৪ মে সৌদি আরবে পৌঁছানোর পর পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন হয়ে যায়। সেখানে তাঁকে একটি অন্ধকার ঘরে আটকে রাখা হয় এবং শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করে আরও ৫ লাখ টাকা দাবি করা হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি। রবিউলের দাবি, তাঁর পরিবার নির্ধারিত সময়ে ওই টাকা দিতে না পারায় তাঁকে ঢাকার ‘রানা’ নামের এক ব্যক্তির কাছে হস্তান্তর করা হয়। রানার কাছে যাওয়ার পরও টাকার জন্য তাঁকে নির্যাতন করা হয় বলে অভিযোগ তাঁর। একপর্যায়ে ২০২৪ সালের ৭ জুন সকালে তিনি এবং আরও প্রায় ২৬ জন ব্যক্তি রিয়াদে কথিত ওই বন্দিশালা থেকে পালিয়ে যান। পরে তাঁরা রিয়াদের লুলু মার্কেটের সামনে অবস্থান নেন। সেখান থেকে রবিউল তাঁর চাচা মুরাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। চাচার পাঠানো টাকা নিয়ে তিনি আলকাসিমের বুরাইদা এলাকায় তাঁর কাছে যান। সেখানে দুই দিন অবস্থান করে কিছুটা সুস্থ হওয়ার পর আবার সোহাগ সওদাগরের সঙ্গে যোগাযোগ করেন বলে জানান তিনি। দেশে ফেরার জন্য আরও ৭০ হাজার টাকা রবিউলের অভিযোগ, সোহাগের সঙ্গে যোগাযোগের পর তাঁকে আবার আটকে রেখে নির্যাতন করা হয়। একপর্যায়ে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরে সোহাগ তাঁর ভাই মামুনকে রবিউলের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন। মামুন রবিউলের স্ত্রীকে জানান, তিনি সৌদি আরবে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন এবং তাঁকে দেশে ফিরিয়ে আনতে আরও ৭০ হাজার টাকা প্রয়োজন। রবিউলের ভাষ্য, পরিবারের সদস্যরা ধারদেনা করে ওই ৭০ হাজার টাকা দেন। এ সময় তাঁর অসুস্থতার কথা উল্লেখ করে একটি স্ট্যাম্পে তাঁর স্ত্রীর স্বাক্ষর নেওয়া হয় বলেও অভিযোগ করেন তিনি। পরে ২০২৪ সালের ২২ জুন তাঁকে দেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয় বলে জানান রবিউল।
টাকা ফেরতের আশ্বাস, পরে সময়ক্ষেপণের অভিযোগ দেশে ফিরে চিকিৎসা নেওয়ার পর সুস্থ হয়ে রবিউল অভিযুক্তদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তাঁর দাবি, তাঁরা বিভিন্ন সময়ে টাকা ফেরত দেওয়ার আশ্বাস দিলেও পরে নানা অজুহাতে সময়ক্ষেপণ করতে থাকেন। রবিউলের অভিযোগ, মামুন তাঁকে জানিয়েছিলেন, তাঁর ভাই সোহাগ দেশে ফেরার পর দুজন বসে পাওনা টাকা পরিশোধ করবেন। কিন্তু সোহাগ দেশে ফেরার পরও তাঁর টাকা ফেরত দেওয়া হয়নি। রবিউলের অভিযোগ, সর্বশেষ ২০২৬ সালের ৩০ জুন বিকেলে প্রেমবাগ স্কুল বাজারে তাঁর সঙ্গে মামুন সওদাগরের পাওনা টাকা নিয়ে দীর্ঘ সময় আলোচনা হয়। একপর্যায়ে মামুন তাঁর কাছে থাকা কালো রঙের একটি ইয়ামাহা ফেজার মোটরসাইকেল রবিউলের কাছে রাখার প্রস্তাব দেন। টাকা পরিশোধ করে পরে মোটরসাইকেলটি নিয়ে যাবেন বলেও জানান বলে দাবি রবিউলের। রবিউল বলেন, ভবিষ্যতে এ নিয়ে কোনো আইনি জটিলতা তৈরি হতে পারে, এমন আশঙ্কায় মামুনের বক্তব্যের একটি ভিডিও ধারণ করা হয়। পরে উভয়ের সম্মতিতে মোটরসাইকেলটি বাজার কমিটির সাধারণ সম্পাদক আকবর হোসেন কালুর জিম্মায় রাখা হয় বলে তাঁর দাবি। তবে কয়েক দিন পর তিনি জানতে পারেন, মামুন সওদাগর মোটরসাইকেলটি ছিনতাই হয়েছে মর্মে অভয়নগর থানায় লিখিত অভিযোগ করেছেন। এ ঘটনায় পরবর্তীতে যশোরে সংবাদ সম্মেলন করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন রবিউল।
রবিউল ইসলামের দাবি, বিদেশে ভালো চাকরির আশায় গিয়ে তিনি আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি শারীরিক ও মানসিকভাবে চরম বিপর্যয়ের শিকার হয়েছেন। তিনি সংশ্লিষ্ট প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে পুরো ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত, প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন, বিদেশে চাকরি দেওয়ার নামে প্রতারণা, নির্যাতন ও মানবপাচারের অভিযোগের তদন্ত এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
একই সঙ্গে তাঁর পাওনা টাকা উদ্ধারের ব্যবস্থা করারও দাবি করেছেন তিনি। রবিউল সাংবাদিকদের উদ্দেশে বলেন, তাঁর অভিযোগটি তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে অনুসন্ধান করে সত্য ঘটনা তুলে ধরা হলে বিদেশে চাকরির প্রলোভনে প্রতারণার শিকার হওয়ার ঝুঁকি সম্পর্কে সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরি হবে। অভিযোগের বিষয়ে সোহাগ সওদাগর ও মামুন সওদাগরের বক্তব্য এই প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি। তাঁদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে যুক্ত করা হবে। ওই সংবাদ সম্মেলনে রবিউল ইসলামসহ উপস্থিত ছিলেন, মোঃ আকবর হোসেন কালু. মোহাম্মদ মুরাদ মোল্লা. মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন মোল্লা।