
বিশেষ প্রতিনিধি, ঝিকরগাছা (যশোর):
ঘুষ গ্রহণ, সরকারি নথি জালিয়াতি, সিন্ডিকেট করে খাস জমি বাণিজ্য এবং সেবাগ্রহীতাদের সাথে চরম দুর্ব্যবহারের অভিযোগে যশোর জেলার ঝিকরগাছা উপজেলা ভূমি অফিসের বিতর্কিত সার্ভেয়ার ফিরোজকে পার্শ্ববর্তী কেশবপুর উপজেলায় বদলি করা হয়েছে। গত ৭ই সেপ্টেম্বর (বৃহস্পতিবার) প্রশাসনিক আদেশে এই বদলির নির্দেশ জারি হয়।
তবে ফিরোজের স্ট্যান্ড রিলিজের খবর ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথেই তাঁর অপকর্মের শিকার ভুক্তভোগীরা একে একে সামনে আসতে শুরু করেছেন। কাজ করে দেওয়ার নামে বিপুল অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেওয়ার পর তাঁর হঠাৎ বদলিতে সাধারণ মানুষ তাঁদের পাওনা টাকা ও নিয়ে গভীর দুশ্চিন্তায় পড়েছেন।
সরেজমিনে অনুসন্ধ্যানে জানা যায়, গত ৬ মাস উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ট্রেনিংয়ে থাকার সুযোগে সার্ভেয়ার ফিরোজ অফিসে অনিয়মিত হয়ে পড়েন। সরকারি দায়িত্ব পালনের তোয়াক্কা না করে তিনি প্রাইভেট আমিনের মতো ব্যক্তিগত কন্টাক্টে চুক্তির মাধ্যমে মানুষের জমি মেপে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিতেন। একদিকে সরকারি বেতন-ভাতা ভোগ করা, অন্যদিকে চুক্তিতে ব্যক্তিগত আমিনগিরি চালিয়ে বেআইনিভাবে ‘দ্বিমুখী লাভ’ নিশ্চিত করতেন তিনি।
উপজেলায় ফিরোজ একটি নিজস্ব দালাল চক্র গড়ে তোলেন। এই চক্রের মূল কাজ ছিল সহজ-সরল মানুষের জমি ঠিক করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে কাজ হাতে নেওয়া। পরবর্তীতে জাল দলিলের মাধ্যমে জমি দালালদের নামে নামজারি করিয়ে তা বিক্রি করে অর্থ ভাগ-বাটোয়ারা করে নেওয়া।
অন্যতম গুরুতর অভিযোগ হলো—যেসব বৈধ জমির নিয়মিত সরকারি খাজনা পরিশোধ করা রয়েছে, সেগুলোকে নথিতে অন্যায়ভাবে ‘খাস জমি’ হিসেবে নথিভুক্ত করা। পরবর্তীতে তা ঠিক করে দেওয়ার নাম করে জমির আসল মালিকদের ব্ল্যাকমেইল করে সর্বস্বান্ত করতেন ফিরোজ।
খাস জমি বাণিজ্যের প্রত্যক্ষ শিকার বাকড়া ইউনিয়নের বাসিন্দা সহজ-সরল মোহাম্মদ সিদ্দিক। তিনি তাঁর সম্পত্তি দেখভাল ও খাজনা পরিশোধের দায়িত্ব দিয়েছিলেন সার্ভেয়ার ফিরোজের অতি ঘনিষ্ঠ শঙ্করপুর ইউনিয়নের আব্দুর রহমানকে।
সিদ্দিকের সমস্ত জমির খাজনা পরিশোধ থাকা সত্ত্বেও ফিরোজ ও আব্দুর রহমান চক্রান্ত করে তাঁর প্রায় ৭ বিঘা জমি সরকারি খাস জমি হিসেবে নথিভুক্ত করে দেন।: সিদ্দিকের অজান্তে জাল দলিলের মাধ্যমে ২৭ শতাংশ জমি আওয়ামী লীগ কর্মী আব্দুর রহমানের নামে হস্তান্তরিত করা হয়, যা পরবর্তীতে বিক্রি করে দুজনে অর্থ ভাগ করে নেন।
জমি মেপে দেওয়ার নাম করে সার্ভেয়ার ফিরোজ সিদ্দিকের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা নিলেও উল্টো পুরো সম্পত্তি খাস বানিয়ে দেন। ভুক্তভোগী মোহাম্মদ সিদ্দিক এই জালিয়াতির বিচারে ইতোমধ্যে আদালতে মামলা দায়ের করেছেন।
ফিরোজের বদলির খবর পাওয়ার পর প্রতারিত সেবাগ্রহীতারা তাঁর সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করলেও তিনি ফোন রিসিভ করছেন না।আব্দুল ওয়াদুদ বলেন কাজ করে দেওয়ার আশ্বাসে ৫০,০০০ টাকা নেওয়ার অভিযোগ করেছেন।হাজেরা খাতুন (কুন্দিপুর) বলেন নামজারির জন্য ২২,০০০ টাকা এবং জমি মাপার চুক্তিতে প্রতিদিন ৮,০০০ টাকা হারে ৩ দিনে ২,৪০,০০০ টাকা দেন ফিরোজকে। তবে টাকা নিলেও তাঁর জমির সমস্যার কোনো সমাধান হয়নি।ফারজানা বেগম বলেন ভূমি অফিসে মিস কেসের ফাইল হারিয়ে গেলে ৫০০ টাকা ঘুষ দিয়ে তা উদ্ধার করতে হয়। পরবর্তীতে আদেশের কপি দেওয়ার জন্য ফিরোজ তাঁর কাছে ৫,০০০ টাকা দাবি করেন।নজরুল ইসলাম (ভুক্তভোগী) ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “শুধু কেশবপুরে বদলি কোনো সমাধান নয়। সেখানে গিয়েও সে একই অপরাধ করবে। এই দুর্নীতিবাজকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা উচিত।”
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ভূমি অফিসের এক কর্মচারী জানান, “ফিরোজ নিজেকে অফিসের বস মনে করতেন। সহকর্মী বা সাধারণ মানুষ—কারো সাথেই ভালো ব্যবহার করতেন না। অফিসে কাজের কথা বলে বাইরে প্রাইভেট আমিনগিরি করতেন। তাঁর ব্যবহারে সবাই অতিষ্ঠ ছিল। বদলি হওয়ায় আমরা ও সাধারণ মানুষ রেহাই পেয়েছি।”
এসব অভিযোগ, জাল দলিল বাণিজ্য ও খাস জমি ব্ল্যাকমেইলের বিষয়ে বক্তব্য জানতে সার্ভেয়ার ফিরোজের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।
এই রিপোর্ট লেখ পর্যন্ত যতটুকু জানা যায় – ফিরোজের কাছে যে সকল ব্যক্তি তাদের কাজের জন্য ঘুষ হিসবে যে টাকা প্রদান করেছিলেন ভুক্তভোগীরা এখন তাঁদের টাকা উদ্ধার ও অন্যায়ভাবে খাস হওয়া জমির অধিকার ফিরে পেতে উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) বরাবর যৌথ আবেদনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।