
নিজস্ব প্রতিবেদক
যশোরের অভয়নগর উপজেলার ভৈরব উত্তর-পূর্ব জনপদে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ-বাণিজ্য এবং বিপুল সম্পদ অর্জনের নানা অভিযোগ উঠেছে ইছামতী গ্রামের মৃত শামসুর খানের ছেলে মো. ফারুক খানের বিরুদ্ধে। স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী মহলের ঘনিষ্ঠ হিসেবে এলাকায় প্রভাব বিস্তার করে তিনি গড়ে তুলেছিলেন একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট। দীর্ঘ অনুসন্ধানে জানা গেছে,
সাবেক এমপির প্রতিনিধি হিসেবে প্রভাবের অভিযোগ তার বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে। স্থানীয় একাধিক সূত্রের দাবি, ফারুক খান দীর্ঘ প্রায় আট বছর যশোর-৪ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য রনজিত কুমার রায়ের প্রতিনিধি হিসেবে এলাকায় সক্রিয় ছিলেন। এ সময় রাজনৈতিক প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে তিনি ভৈরব উত্তর-পূর্ব জনপদে নিজের একটি শক্তিশালী প্রভাববলয় সিন্ডিকেট তৈরি করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, রাজনৈতিক কর্মসূচি, নির্বাচনকেন্দ্রিক কার্যক্রম এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্রে ফারুক খান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতেন। এমনকি তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের প্রভাব কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন নির্বাচনে ভোটকেন্দ্র নিয়ন্ত্রণ ও অনিয়মের সঙ্গেও তার সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে।
ফারুক খানের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন উঠেছে একাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সভাপতির দায়িত্ব পালন নিয়ে। স্থানীয় সূত্র ও সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি পল্লী মঙ্গল আদর্শ মহাবিদ্যালয়, নাউলী মিলনিয়া দাখিল মাদ্রাসা এবং বাশুয়াড়ী দাখিল মাদ্রাসাসহ একাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। হিদিয়া এ এন এইচ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ক্ষেত্রেও তার প্রভাব ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের প্রশ্ন, একজন ব্যক্তির একই সময়ে বা ধারাবাহিকভাবে একাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে আসীন হওয়ার পেছনে রাজনৈতিক প্রভাব কতটা কাজ করেছে?
আরও গুরুতর অভিযোগ হলো, এসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগকে কেন্দ্র করে বিপুল অর্থ লেনদেন হয়েছে। নিয়োগ বানিজ্যের নামে অদক্ষ শিক্ষক নিয়োগ দিয়ে লুটে নিয়েছেন বিপুল অর্থ। এমনকি নিজের ক্ষমতাবলে পল্লী মঙ্গল আদর্শ মহাবিদ্যালয়ে নিজের ভাগ্নাদের চাকরি দিয়ে ২০ শতাংশ জমি বিদ্যালয়ে দানের অজুহাতে নিজের নামে রেজিষ্ট্রি করে নিয়েছে। পল্লী মঙ্গল আদর্শ মহাবিদ্যালয়ে একই পরিবারের তিনজনের নিয়োগ নিয়ে স্থানীয়ভাবে ব্যাপক আলোচনা রয়েছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, ছালাম শিকদারের ছেলে রাকিব শিকদার, কালাম শিকদারের ছেলে সোহাগ শিকদার এবং হাফিজ শিকদারের ছেলে আকাশ শিকদার একই প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন। এছাড়াও ওই বিদ্যালয়ে মোট ৫ জন শিক্ষক নিয়োগ দিয়ে কোটি টাকার উপরে লুটপাট করা হয়েছে। এব্যাপারে
স্থানীয়দের প্রশ্ন, একই পরিবারের একাধিক সদস্যের নিয়োগ প্রক্রিয়ায় যথাযথ প্রতিযোগিতা, যোগ্যতা, নিয়োগ নীতিমালা ও স্বচ্ছতা অনুসরণ করা হয়নি। সরকারি ভাবে এ বিষয়টি যাচাই করতে নিয়োগসংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তি, আবেদনপত্র, নিয়োগ বোর্ডের কার্যবিবরণী, মেধাতালিকা এবং পরিচালনা কমিটির রেজুলেশন পর্যালোচনা করলেই কর্তৃপক্ষ বুঝতে পারবেন, যে নিয়োগের নামে কতটা দুর্নীতি ওই ফারুক খানসহ তার সিন্ডিকেট করেছে। জিরো থেকে হিরো, সম্পদের উৎস নিয়ে যত প্রশ্ন স্থানীয়দের অভিযোগ, একসময় তুলনামূলকভাবে স্বল্প সম্পদের মালিক ফারুক খান বর্তমানে বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন। তার সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৩০০ কোটি টাকা বলে এলাকায় আলোচনা রয়েছে। এবিষয়ে অনুসন্ধান করতে গিয়ে জানা যায়
ফুলতলা বাজারে তার একটি তিনতলা বিলাসবহুল ভবন রয়েছে। ইছামতী গ্রামে রয়েছে নিজস্ব বাড়ি। এ ছাড়া ঘের ব্যবসায় তার বিপুল বিনিয়োগ রয়েছে বলে স্থানীয়রা দাবি করছেন। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, গুচ্ছগ্রাম এলাকা পার হয়ে প্রায় ৮৩ বিঘা জমির একটি ঘেরসহ আরও কয়েকটি ঘের রয়েছে তার নিয়ন্ত্রণে। তবে এসব জমির কতটুকু তার নিজস্ব এবং কতটুকু লিজ নেওয়া, তা ভূমি রেকর্ড, খাজনা, লিজ দলিল ও সংশ্লিষ্ট নথি যাচাই ছাড়া নিশ্চিত হওয়া সম্ভব নয়। ব্যাংক হিসাবে ‘টাকার পাহাড়, প্রমাণ কোথায়? ফারুক খানের নামে বিভিন্ন ব্যাংকে বিপুল অর্থ রয়েছে বলেও স্থানীয়ভাবে নানা আলোচনা রয়েছে। কেউ কেউ ব্যাংক ব্যালান্সসহ তার মোট সম্পদের অঙ্ক শত শত কোটি টাকা বলে দাবি করছেন। তবে ব্যাংক হিসাব ব্যক্তিগত ও গোপনীয় তথ্য হওয়ায় সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের বৈধ নথি বা সরকারি তদন্ত প্রতিবেদন ছাড়া এ ধরনের দাবি নিশ্চিত করা যায়নি। তাই প্রশ্ন উঠছে, তার বর্তমান সম্পদের প্রকৃত পরিমাণ কত? সম্পদের অর্থের উৎস কী? আয়কর নথিতে এসব সম্পদের ঘোষণা রয়েছে কি না? তার নামে বা পরিবারের সদস্যদের নামে থাকা জমি, ভবন, ঘের ও ব্যবসায়িক বিনিয়োগের অর্থের উৎস কী? আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগের অভিযোগ। সম্প্রতি নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের সঙ্গে ফারুক খানের যোগাযোগ রয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি অডিওকে কেন্দ্র করে এ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, বর্তমান সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে বিভিন্ন কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা এবং অভয়নগরের পরিবেশ অস্থিতিশীল করার পরিকল্পনায় তিনি যুক্ত। অভিযোগের বিষয়ে ইছামতী গ্রামের মো. ফারুক খান বলেন, ফুলতলায় তার বাড়ি কেনার সময় ২০১১ সাল বলে উল্লেখ করেন। ঘেরের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, কিছু জমি তিনি কিনেছেন এবং বাকি জমি লিজ নেওয়া। একই পরিবারের তিনজনকে চাকরি দেওয়ার বিষয়টি তিনি স্বীকার করেছেন। একাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সভাপতির দায়িত্ব পালন করার কথাও তিনি স্বীকার করেন। তবে নিজের বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতি ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করে ফারুক খান বলেন, তিনি কোনো দুর্নীতি করেননি। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগের অভিযোগও তিনি অস্বীকার করেন। তার ভাষ্য, কারও সঙ্গে তার কোনো কথা বা যোগাযোগ হয় না। তিনি আরও বলেন, আমি ইতিপূর্বে হজ্ব পালন করে আসছি। জরুরি ভাবে সকল বিষয়ে তদন্ত করে কঠোর আইনগত পদক্ষেপ নিতে সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও দায়িত্বরত কর্তৃপক্ষের কাছে দাবি করেছেন এলাকাবাসী ও সচেতন মহল। তারা জানান, তদন্তেই বেরিয়ে আসতে পারে প্রকৃত চিত্র। স্থানীয়দের দাবি, এসব বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত হলে ফারুক খানের উত্থান, সম্পদের উৎস এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তার ভূমিকার প্রকৃত চিত্র সামনে আসতে পারে। অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে প্রশ্ন উঠবে, কীভাবে রাজনৈতিক ক্ষমতার ছায়ায় একজন ব্যক্তি এত বড় সম্পদ ও প্রভাববলয় গড়ে তুললেন? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর এখন নিরপেক্ষ তদন্তের অপেক্ষায়।