
বুকে ছয় মাসের অবুঝ শিশু। শরীরে নির্যাতনের ক্ষত। চোখে সংসার টিকিয়ে রাখার আকুতি। এর মধ্যেই স্বামীর পাঠানো তালাকের নোটিশ। স্বামীর ঘরে ফিরে সন্তানকে নিয়ে একটু নিরাপদ জীবনের আশায় দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন যশোরের মণিরামপুর উপজেলার বিথীকা সুলতানা (২৭)। তার অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে স্বামী ও শাশুড়ির নির্যাতন, অর্থের দাবি এবং স্বামীর পরকীয়ার প্রতিবাদ করতে গিয়ে তাকে শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে। বিথীকা সুলতানা উপজেলার দূর্বাদাঙ্গা ইউনিয়নের বাহিরঘরিয়া গ্রামের কৃষক মহাতাপের মেয়ে। ২০২৩ সালের ১৭ এপ্রিল একই ইউনিয়নের কাজীয়াড়া গ্রামের মৃত খালেক গাজীর ছেলে মেহেদী হাসানের সঙ্গে পারিবারিকভাবে তার বিয়ে হয়।
বিথীকার ভাষ্য, বিয়ের প্রথম দিকে সংসার মোটামুটি চললেও পরবর্তীতে স্বামী ও শাশুড়ির সঙ্গে তার বিরোধ শুরু হয়। স্বামীর আর্থিক সংকটের কথা বিবেচনা করে তার বাবা মেয়ের সংসার টিকিয়ে রাখতে চায়ের দোকান দেওয়ার জন্য জামাইকে ৭০ হাজার টাকা দেন। পাশাপাশি বিভিন্ন সময় চাল-ডালসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী এবং পাঁচটি ছাগলও দেওয়া হয় বলে দাবি বিথীকার পরিবারের।
তবে এসব সহযোগিতার পরও সংসারে শান্তি ফেরেনি বলে অভিযোগ তার। বরং টাকা-পয়সার দাবিতে তাকে মানসিক ও শারীরিকভাবে নির্যাতন করা হতো বলে দাবি করেন বিথীকা। বিথীকার দাবি, স্বামীর অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ ও আর্থিক অবস্থার কথা চিন্তা করে তিনি সন্তান নিতে আগ্রহী ছিলেন না। কিন্তু স্বামী ও শাশুড়ির চাপের কারণে পরবর্তীতে তিনি গর্ভবতী হন। সন্তান প্রসবের সময় ঘনিয়ে এলে নির্যাতনের মাত্রা আরও বেড়ে যায় বলে অভিযোগ তার। একপর্যায়ে বাধ্য হয়ে বাবার বাড়িতে গিয়ে সন্তান প্রসব করেন বিথীকা। তার অভিযোগ, একই ইউনিয়নে বসবাস করলেও সন্তান জন্মের পর স্বামী মাত্র একদিন হাসপাতালে দেখতে যান। এরপর স্ত্রী ও সন্তানকে নিজের বাড়িতে নিয়ে যেতে অনীহা প্রকাশ করেন তিনি। বাবার বাড়িতে প্রায় ছয় মাস থাকার পর বুকের শিশুকে কোলে নিয়ে স্বামীর চায়ের দোকানে গিয়ে ওঠেন বিথীকা। স্থানীয়দের হস্তক্ষেপে মেহেদী তাকে বাড়িতে তুললেও সেখানে নতুন করে সমস্যার সৃষ্টি হয় বলে অভিযোগ তার।
বিথীকার অভিযোগ, তার শাশুড়ি লালভানু বেগম ঘরে তালা দিয়ে দেন। পরে স্থানীয় মাতব্বরদের হস্তক্ষেপে তালা খোলা হলেও স্ত্রী ও শিশুর জন্য নিয়মিত খাবার কিংবা ভরণপোষণের ব্যবস্থা করা হয়নি। এ সময় বিথীকা জানতে পারেন, স্বামী মেহেদী হাসান চায়ের দোকানের পাশের এক ব্যক্তির প্রবাসী ছেলে রিয়াজুলের স্ত্রী মুক্তা বেগমের সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্কে জড়িয়েছেন, এমন অভিযোগ করেন তিনি।
বিথীকার দাবি, বিষয়টির প্রতিবাদ করতে গিয়ে তিনি উল্টো লাঞ্ছনার শিকার হন। এমনকি পারিবারিক ও স্থানীয় প্রভাবশালীদের চাপে কথিত ওই নারীর কাছে গিয়ে তাকে ক্ষমা চাইতেও বাধ্য করা হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি। এ ছাড়া স্বামী মেহেদী হাসান মাদকাসক্ত বলেও অভিযোগ করেছেন বিথীকা। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা নিশ্চিত করা যায়নি। বিথীকার অভিযোগ, স্বামীর কথিত পরকীয়ার গোপন মোবাইল আলাপের প্রতিবাদ করায় ০৯ মার্চ ২০২৫ তারিখে তাকে ও তার ছয় মাস বয়সী সন্তানকে ঘরের দরজা বন্ধ করে রড দিয়ে মারধর করা হয়। এ ঘটনায় স্বামী মেহেদী হাসান ও তার মা লালভানু বেগম জড়িত ছিলেন বলে অভিযোগ তার। মারধরে আহত হয়ে বিথীকার মণিরামপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নেওয়ার দাবি রয়েছে। তার পক্ষ থেকে হাসপাতালের জরুরি বিভাগের পুলিশ কেস-সংক্রান্ত একটি নথির কপিও সংরক্ষিত থাকার কথা জানানো হয়েছে। তবে ওই নথির পূর্ণাঙ্গ বিষয়বস্তু ও মামলার বর্তমান অবস্থা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।
হাসপাতাল থেকে চিকিৎসা নেওয়ার পরও সংসারটি টিকিয়ে রাখার চেষ্টা চালিয়ে যান বিথীকা। স্থানীয় মাতব্বর ও থানায় যোগাযোগ করে স্বামীর সংসারে ফেরার চেষ্টা করেন তিনি। কিন্তু তার দাবি, ঠিক সেই সময় তার কাছে তালাকের নোটিশ পাঠানো হয়।
বিথীকার ভাষ্য, তিনি অন্যায়ভাবে সংসার থেকে বিচ্ছিন্ন হতে চান না। সন্তানকে নিয়ে স্বামীর ঘরে ফিরে স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে চান। এ কারণে তালাকের নোটিশ গ্রহণ না করে আইনি সহায়তার মাধ্যমে বিষয়টির মোকাবিলা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি। বিথীকা আরও অভিযোগ করেন, তার সংসার ভাঙার পেছনে স্বামীর বড় ভাই সোহরাব হোসেনের ভূমিকা রয়েছে। তিনি মণিরামপুর পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের শিক্ষক এবং জামায়াতের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত, এমন দাবি করেছেন বিথীকা।
তবে সোহরাব হোসেন তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সঙ্গে জড়িত থাকার বিষয়টি অস্বীকার করে দায় এড়িয়ে গেছেন বলে জানা গেছে। বিথীকার স্বামী মেহেদী হাসান তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো অস্বীকার করেছেন। উল্টো তিনি দাবি করেছেন, তার মা হামলার শিকার হয়েছেন। স্থানীয় বাসিন্দা মোশারফ হোসেন ও জসিম বলেন, বিথীকা দীর্ঘদিন ধরে সংসার টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করেছেন। তাদের ভাষ্য, মেয়েটির ওপর অন্যায় করা হয়েছে এবং সংসার বাঁচানোর জন্য তিনি অনেক কিছু সহ্য করেছেন। বিথীকা সুলতানা বলেন, থানা প্রথমে মামলা নেয়নি। এখন আমি লিগ্যাল এইডের মাধ্যমে আইনি লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছি। আমি আমার নিষ্পাপ সন্তানটাকে নিয়ে বড় বিপদে আছি। একদিকে শরীরে নির্যাতনের ক্ষত, অন্যদিকে স্বামীর ঘরে ফিরে যাওয়ার আকুতি, সবকিছুর মাঝেই ছয় মাসের শিশুকে বুকে নিয়ে দিন কাটাচ্ছেন বিথীকা। তার অভিযোগ সত্য হলে, একজন নারী ও তার শিশুর নিরাপত্তা, ভরণপোষণ এবং আইনগত অধিকার নিশ্চিত করার বিষয়টি সামনে আসে।
এখন প্রশ্ন, বিথীকার অভিযোগের সত্যতা তদন্ত করে আইন কী ব্যবস্থা নেয়? আর ছয় মাসের এই শিশুটির ভবিষ্যৎই বা কোথায়?
বিথীকার দাবি, তিনি প্রতিশোধ চান না; চান তার ও সন্তানের অধিকার, নিরাপত্তা এবং ন্যায়বিচার। এখন সেই ন্যায়বিচারের দরজায় পৌঁছাতে পারবেন কি এই অসহায় নারী, সেটিই দেখার বিষয়।