
নিজস্ব প্রতিবেদক
চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জে নাছরুম আক্তার নামের এক নারীর বিরুদ্ধে একাধিক বিয়ে, আপত্তিকর ভিডিও ধারণ করে ‘হানি ট্র্যাপ’ ও ব্ল্যাকমেইল, অর্থ-স্বর্ণালংকার আত্মসাৎ এবং নানা ধরনের প্রতারণার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত ও আইনি প্রতিকার চেয়ে জেলা লিগ্যাল এইড কার্যালয়ে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন মৃত প্রবাসী সাইফুল ইসলাম মাসুমের বাবা আবুল বাশার। বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) দেওয়া অভিযোগে আবুল বাশার দাবি করেন, তাঁর ছেলে মাসুমকে আপত্তিকর ভিডিওর মাধ্যমে ব্ল্যাকমেইল করে বিয়েতে বাধ্য করেন নাছরুম আক্তার। পরে প্রবাসীর উপার্জনের অর্থ দিয়ে জমি কেনার কথা বলে কৌশলে নিজের নামে জমি রেজিস্ট্রি করিয়ে নেওয়া হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, গত ১৩ এপ্রিল সৌদি আরবে এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান মাসুম। তাঁর মৃত্যুর পরও নাছরুম ওই পরিবারের ওপর আর্থিক চাপ অব্যাহত রাখেন বলে অভিযোগ করেন আবুল বাশার। একপর্যায়ে শ্বশুরবাড়ি থেকে বিপুল পরিমাণ স্বর্ণালংকার ও নগদ অর্থ নিয়ে যাওয়ার অভিযোগও করা হয়েছে। এ ঘটনায় পরিবারটির পক্ষ থেকে আগেই ফরিদগঞ্জ থানায় লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছিল বলে দাবি করা হয়। সমাধান না হওয়া পর্যন্ত বাবার বাড়িতে থাকতে বলা হয়েছিল আবুল বাশারের অভিযোগ, বিষয়টি মীমাংসা না হওয়া পর্যন্ত নাছরুমকে তাঁর বাবার বাড়িতে অবস্থান করতে বলা হয়েছিল। কিন্তু গত ১৮ আগস্ট তিনি তাঁর ভগ্নিপতি নয়নসহ কয়েকজন বহিরাগতকে সঙ্গে নিয়ে শ্বশুরবাড়িতে আসেন। সেখানে পরিবারের সদস্যদের নানাভাবে হয়রানি এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মানহানিকর প্রচারণা চালানোর অভিযোগ করা হয়েছে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ায় শেষ পর্যন্ত ন্যায়বিচার ও আইনি সুরক্ষার আশায় জেলা লিগ্যাল এইড কার্যালয়ের দ্বারস্থ হয়েছে পরিবারটি।
অভিযোগপত্রে মাসুমের সঙ্গে নাছরুমের বিয়ের নথিপত্র নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
আবুল বাশারের দাবি, প্রথমে অ্যাডভোকেট নওশেদের স্বাক্ষরযুক্ত একটি হলফনামা দেখিয়ে মাসুমের সঙ্গে বিয়ের দাবি করেন নাছরুম। পরে বিষয়টি যাচাই করতে গিয়ে ওই আইনজীবী এমন কোনো হলফনামা দেওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করেন এবং লিখিতভাবে তা জানিয়েছেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়। এরপর শাহমাহমুদপুর এলাকার এক কাজির স্বাক্ষর করা একটি কাবিননামা উপস্থাপন করা হলেও সংশ্লিষ্ট কাজি লিখিত প্রত্যয়নে জানিয়েছেন, ওই কাবিননামাটি রেজিস্ট্রিভুক্ত হয়নি, এমন দাবিও করা হয়েছে অভিযোগপত্রে।
আরও কয়েকজনকে বিয়ের ফাঁদে ফেলার অভিযোগ
স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দার বরাতে অভিযোগ উঠেছে, নাছরুম আক্তারের বিরুদ্ধে এর আগেও বিভিন্ন ব্যক্তিকে বিয়ের ফাঁদে ফেলে অর্থ ও মূল্যবান সামগ্রী নেওয়ার অভিযোগ ছিল। অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, ফরিদ নামের এক যুবককে ব্ল্যাকমেইল করে বিয়ের পর তাঁর কাছ থেকে ফার্নিচার, স্বর্ণালংকার ও এফডিআরের টাকা নেওয়া হয়। এ ছাড়া মাইনুদ্দিন, খোরশেদ, রফিকুল ইসলাম মন্টু ও সাগর নামের আরও কয়েকজনের সঙ্গে বিয়ের নাটক সাজিয়ে প্রতারণা ও কাবিনের অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের স্বতন্ত্র ও নিরপেক্ষ সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। ফলে তদন্ত ছাড়া এসব অভিযোগকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। নাছরুমের বক্তব্য, আগে ৫০টি বিয়ে হলেও সমস্যা নেই, অভিযোগের বিষয়ে জানতে নাছরুম আক্তারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি নিজের একাধিক বিয়ের বিষয়টি স্বীকার করেন। তবে প্রতারণা, ব্ল্যাকমেইল ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ অস্বীকার করেন তিনি।
নাছরুম বলেন, আমার আগে ৫০টি বিয়ে হলেও সমস্যা নেই। সবাই সব জেনে-শুনেই আমাকে বিয়ে করে। মাসুমের সঙ্গে নিজের সম্পর্কের বিষয়ে তিনি বলেন, আমি মাসুমের স্ত্রী। মাসুমের বাড়িতেই তিন বছর ধরে সংসার করছি। মাসুম মারা গেছে, তাতে সমস্যা নেই। আমি ওই বাড়িতেই থাকব।
মাসুমের পরিবারের অভিযোগ, একদিকে বিয়ের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন, অন্যদিকে অর্থ-স্বর্ণালংকার আত্মসাৎ ও ব্ল্যাকমেইলের অভিযোগ, সবকিছু মিলিয়ে তাঁরা চরম মানসিক চাপের মধ্যে রয়েছেন। তাঁদের দাবি, সংশ্লিষ্ট নথিপত্র, বিয়ের কাবিন, হলফনামা, জমির দলিল, আর্থিক লেনদেন এবং অভিযোগে উল্লিখিত ব্যক্তিদের বক্তব্য যাচাই করে নিরপেক্ষ তদন্ত করা হোক। পরিবারটি নাছরুমের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের তদন্ত, হয়রানি থেকে সুরক্ষা এবং আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছে। তবে অভিযোগগুলোর সত্যতা এখনো আদালত বা তদন্তকারী কোনো কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হয়নি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্তের পরই এ ঘটনার প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হবে।