
নিজস্ব প্রতিবেদক
মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিষয়ে বাংলাদেশ ও ভারত আলোচনার মাধ্যমে একটি সমাধানে পৌঁছাবে বলে আশা প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। একই সঙ্গে আওয়ামী লীগের কার্যক্রমের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হবে কি না, সে সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের সরকারকেই নিতে হবে বলে জানিয়েছে ওয়াশিংটন।
তবে শেখ হাসিনার সঙ্গে কী করা উচিত, এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র এখনো কোনো নির্দিষ্ট অবস্থান নেয়নি বলেও জানিয়েছে মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
নিউইয়র্কে বুধবার অনুষ্ঠিত এক ‘অন-ব্যাকগ্রাউন্ড’ ব্রিফিংয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের অবস্থান তুলে ধরেন মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা। নিউইয়র্ক ফরেন প্রেস সেন্টারে ‘একটি স্থিতিশীল, সমৃদ্ধ ও সার্বভৌম দক্ষিণ এশিয়ার সমর্থনে মার্কিন নীতি’ শীর্ষক ওই ব্রিফিংয়ে বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল ও শ্রীলঙ্কার সাংবাদিকেরা অংশ নেন।
শেখ হাসিনা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান
২০২৪ সালের আন্দোলনের পর ক্ষমতাচ্যুত হয়ে শেখ হাসিনা বর্তমানে ভারতে অবস্থান করছেন। আন্দোলন দমনে প্রাণঘাতী দমন-পীড়নের নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগে গত নভেম্বরে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তাঁর অনুপস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ডের রায় দেন।
এ অবস্থায় শেখ হাসিনা দেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণ এবং নিজের অনুপস্থিতিতে চলা বিচার চ্যালেঞ্জ করার সুযোগ পাওয়ার কথা জানিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি নিজের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
ব্রিফিংয়ে শেখ হাসিনার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান জানতে চাইলে মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওই কর্মকর্তা বলেন, এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক অবস্থান নেয়নি।
তিনি বলেন, বিষয়টি বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বিরোধের একটি বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই দুই দেশ নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে একটি সমাধানে পৌঁছাবে বলে যুক্তরাষ্ট্র আশা করে।
ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, শেখ হাসিনার সঙ্গে কী হওয়া উচিত—এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র এখনো নির্দিষ্ট কোনো অবস্থান জানায়নি।
আওয়ামী লীগের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের
ব্রিফিংয়ে আওয়ামী লীগের কার্যক্রমের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হবে কি না, সে বিষয়েও যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান জানতে চান সাংবাদিকেরা।
জবাবে মার্কিন কর্মকর্তা বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নিয়ে মন্তব্য করতে অনাগ্রহ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশের সঙ্গে এবং বিএনপির সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক বর্তমানে খুবই ভালো অবস্থায় রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র নির্বাচিত সরকারের সঙ্গে কাজ চালিয়ে যেতে চায়। বাংলাদেশকে আরও শক্তিশালী ও নিরাপদ করার চলমান প্রচেষ্টার পাশে থাকার কথাও জানান তিনি।
বাংলাদেশকে আরও সমৃদ্ধ করতে যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতার কোনো ঘাটতি থাকবে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নিয়ে মন্তব্য করা সমীচীন হবে না।
আওয়ামী লীগের কার্যক্রমের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিষয়টি নির্দিষ্ট করে জানতে চাইলে মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, এ সিদ্ধান্ত বাংলাদেশ সরকারকেই নিতে হবে।
যুক্তরাষ্ট্র-ভারত-চীন: কারও পক্ষ নিতে বলছে না ওয়াশিংটন
ব্রিফিংয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র, ভারত ও চীনের সম্পর্ক নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। এক সাংবাদিক জানতে চান, তিন বৃহৎ শক্তির মধ্যে কোনো একটি পক্ষ বেছে না নিয়ে বাংলাদেশ কীভাবে সবার সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখতে পারে এবং বিষয়টিকে যুক্তরাষ্ট্র কীভাবে দেখছে।
জবাবে মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, ভৌগোলিকভাবে বাংলাদেশ বিশ্বের একটি জটিল অঞ্চলে অবস্থিত। যুক্তরাষ্ট্র সবসময় প্রতিটি দেশকে নিজ নিজ পরিমণ্ডলে অবস্থান করার সুযোগ দেওয়ার পক্ষে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব সুসংহত রাখা এবং দেশের ব্যবস্থাকে নিরাপদ রাখতে যুক্তরাষ্ট্র সহযোগিতা করতে চায়।
ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে কোনো একটি দেশ বেছে নিতে বলছে না; বরং বিকল্প অংশীদার হিসেবে কাজ করতে চায়।
তারেক রহমানের সঙ্গে ট্রাম্পের সাক্ষাৎ নিয়ে যা বলল যুক্তরাষ্ট্র
ব্রিফিংয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য বৈঠক নিয়েও প্রশ্ন করা হয়।
জবাবে মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, প্রেসিডেন্টের সময়সূচি সম্পর্কে তিনি কোনো মন্তব্য করতে পারবেন না।
তবে তিনি জানান, চলতি সপ্তাহে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের সঙ্গে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের খুব সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য সাক্ষাতের সুযোগ হয়েছিল। এ সময় ট্রাম্পের সঙ্গে ছবি তোলারও সুযোগ হয়।
মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, সব দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সাক্ষাৎ বা ছবি তোলার সুযোগ হয়নি।
দক্ষিণ এশিয়া নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের নীতি
এর আগে নিউইয়র্ক ফরেন প্রেস সেন্টারে মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দক্ষিণ ও সেন্ট্রাল এশিয়া বিষয়ক উপ-সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী বিথানী মরিসন দক্ষিণ এশিয়ার বর্তমান পরিস্থিতি এবং ট্রাম্প প্রশাসনের নীতির আলোকে বক্তব্য দেন।
পরে তিনি সাংবাদিকদের সঙ্গে ফটো সেশনে অংশ নেন।
ব্রিফিংয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির প্রতি সহযোগিতার কথা তুলে ধরা হয়। একই সঙ্গে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিষয়ে সরাসরি অবস্থান না নেওয়ার কথাও স্পষ্ট করা হয়েছে।